ইরান যুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের

ইরান যুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের
মোসাদ্দেকুর রহমান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মাত্র কয়েক দিনেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। চলমান যুদ্ধ ও চরম উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্য এখন আবার বর্তমান-ভবিষ্যতের এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের সামরিক কৌশল শুধুই লক্ষ্য অর্জন করা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
সর্বশেষ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেতৃত্বের একটি রাজনৈতিক ভুল। কারণ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এতো বছর সামরিক অভিযান চালিয়েও তারা আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনা সদস্য বিমানে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আবার তাদের চিরাচরিত জীবনে ফিরে যায়, সামরিক অভিযান শুরুর আগে তারা ঠিক যেমন ছিল। এরপর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবে না, যা তাদেরকে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি করে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প নিজেই মধ্যপ্রাচ্যে আবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছেন।
যুদ্ধের ব্যয় ও বাস্তবতা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ২০২৬ সালের পুরো মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ০.১ শতাংশের সমান। অভিযানে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যাপক ব্যবহার এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রধান কারণ।

পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনই কোনো ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে ব্যয় ছাড়াতে পারে হাজার কোটি ডলার। কারণ ইরানের মতো শক্তিশালী এবং আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল অস্ত্রের ব্যবহারই নয়, বরং জ্বালানি, রসদ, সেনাঘাঁটি পরিচালনা—সবকিছুর সমন্বয়। এতে বলাই যায় যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জয়ী হলেও নিঃসন্দেহে আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন কার্যকরী, তেমনি ব্যয়বহুল। একটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার। একটি স্টেলথ বোমারু বিমানের একবারের মিশন পরিচালনার ব্যয়ও কয়েক মিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং বিমান অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে ব্যয় দ্রুতই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এসব অস্ত্রের উৎপাদন ব্যয়ই শুধু নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া, জ্বালানি, পাইলট প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের ব্যয় কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের সময় যেমন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কারণে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছিল, তেমনটি হলে ইরান অভিযানেও একই পরিণতি হতে পারে।

ইরানের পাল্টা হামলা বাড়াচ্ছে ব্যয়
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ইরানের পাল্টা আঘাতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা অপ্রস্তুত ছিল। অথবা তারা ভাবতে পারেনি যে এভাবে পাল্টা আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। এই পাল্টা আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।
ইরানের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, তারও আলাদা ব্যয় আছে। ইরানের একটি ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তেলের দাম বেড়ে যায়। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব অন্য সবকিছুর ওপর পড়ে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে গিয়ে সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রশ্নও উঠতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ চলাচল করলে প্রতিরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত পথ ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগেে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক কার্যালয় পেন্টাগনের ভেতরে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ যদি ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে চাপ পড়তে পারে। প্যাট্রিয়ট, থাড বা নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল সিস্টেম প্রতিস্থাপন সময় সাপেক্ষ। এসব অস্ত্রের উৎপাদন সীমিত, আর তা বিশ্বব্যাপী মিত্রদের কাছে সরবরাহ করতে হয়।
এ ছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ যুদ্ধের ব্যয় ও কৌশল নিয়ে সরব। তারা ইরান যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে চান। এমনকি তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাত থেকে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর দীর্ঘায়িত যুদ্ধ মানেই বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। তখনও শুরুতে দ্রুত সাফল্যের আশা ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ জটিল হয়েছে, ব্যয় বেড়েছে, জনমত বদলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন—ইরানে দীর্ঘমেয়াদে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে।

‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের’
বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এই যুদ্ধ যদি এক বা দুই সপ্তাহে শেষ না হয়, তবে এর প্রভাব শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না-এটি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘ সংঘাতের দরুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি করবে।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তাই মার্কিন কংগ্রেস এই ইতিহাসের শিক্ষাকে স্মরণে রেখে বর্তমান পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

জনমত ও রাজনৈতিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনমতও বিভক্ত। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সময়সীমা ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উঠছে প্রশ্ন । যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে তবে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
কংগ্রেসে বাজেট অনুমোদন, ঋণসীমা, প্রতিরক্ষা ব্যয়-সবকিছু নতুন করে আলোচনায় আসবে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক লড়াইও।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট কত ব্যয় হতে পারে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বাস্তব ব্যয় বহুগুণ বেশি হয়। ইরানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অস্ত্রের ব্যবহার ও আঞ্চলিক জটিলতা ব্যয়কে আরও বাড়াতে পারে। এটি কৌশলগত অবস্থান, রাজনৈতিক সমর্থন, সামরিক মজুদ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
তাই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাবে, নাকি দীর্ঘ অভিযানের ভার নিয়ে আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষা করবে। তবে এ প্রশ্নের উত্তরটি নির্ভর করছে মার্কিন প্রশাসনের আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মাত্র কয়েক দিনেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। চলমান যুদ্ধ ও চরম উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্য এখন আবার বর্তমান-ভবিষ্যতের এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের সামরিক কৌশল শুধুই লক্ষ্য অর্জন করা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
সর্বশেষ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেতৃত্বের একটি রাজনৈতিক ভুল। কারণ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এতো বছর সামরিক অভিযান চালিয়েও তারা আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনা সদস্য বিমানে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আবার তাদের চিরাচরিত জীবনে ফিরে যায়, সামরিক অভিযান শুরুর আগে তারা ঠিক যেমন ছিল। এরপর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবে না, যা তাদেরকে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি করে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প নিজেই মধ্যপ্রাচ্যে আবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছেন।
যুদ্ধের ব্যয় ও বাস্তবতা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ২০২৬ সালের পুরো মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ০.১ শতাংশের সমান। অভিযানে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যাপক ব্যবহার এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রধান কারণ।

পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনই কোনো ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে ব্যয় ছাড়াতে পারে হাজার কোটি ডলার। কারণ ইরানের মতো শক্তিশালী এবং আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল অস্ত্রের ব্যবহারই নয়, বরং জ্বালানি, রসদ, সেনাঘাঁটি পরিচালনা—সবকিছুর সমন্বয়। এতে বলাই যায় যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জয়ী হলেও নিঃসন্দেহে আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন কার্যকরী, তেমনি ব্যয়বহুল। একটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার। একটি স্টেলথ বোমারু বিমানের একবারের মিশন পরিচালনার ব্যয়ও কয়েক মিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং বিমান অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে ব্যয় দ্রুতই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এসব অস্ত্রের উৎপাদন ব্যয়ই শুধু নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া, জ্বালানি, পাইলট প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের ব্যয় কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের সময় যেমন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কারণে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছিল, তেমনটি হলে ইরান অভিযানেও একই পরিণতি হতে পারে।

ইরানের পাল্টা হামলা বাড়াচ্ছে ব্যয়
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ইরানের পাল্টা আঘাতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা অপ্রস্তুত ছিল। অথবা তারা ভাবতে পারেনি যে এভাবে পাল্টা আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। এই পাল্টা আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।
ইরানের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, তারও আলাদা ব্যয় আছে। ইরানের একটি ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তেলের দাম বেড়ে যায়। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব অন্য সবকিছুর ওপর পড়ে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে গিয়ে সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রশ্নও উঠতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ চলাচল করলে প্রতিরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত পথ ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগেে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক কার্যালয় পেন্টাগনের ভেতরে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ যদি ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে চাপ পড়তে পারে। প্যাট্রিয়ট, থাড বা নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল সিস্টেম প্রতিস্থাপন সময় সাপেক্ষ। এসব অস্ত্রের উৎপাদন সীমিত, আর তা বিশ্বব্যাপী মিত্রদের কাছে সরবরাহ করতে হয়।
এ ছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ যুদ্ধের ব্যয় ও কৌশল নিয়ে সরব। তারা ইরান যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে চান। এমনকি তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাত থেকে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর দীর্ঘায়িত যুদ্ধ মানেই বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। তখনও শুরুতে দ্রুত সাফল্যের আশা ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ জটিল হয়েছে, ব্যয় বেড়েছে, জনমত বদলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন—ইরানে দীর্ঘমেয়াদে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে।

‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের’
বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এই যুদ্ধ যদি এক বা দুই সপ্তাহে শেষ না হয়, তবে এর প্রভাব শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না-এটি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘ সংঘাতের দরুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি করবে।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তাই মার্কিন কংগ্রেস এই ইতিহাসের শিক্ষাকে স্মরণে রেখে বর্তমান পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

জনমত ও রাজনৈতিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনমতও বিভক্ত। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সময়সীমা ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উঠছে প্রশ্ন । যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে তবে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
কংগ্রেসে বাজেট অনুমোদন, ঋণসীমা, প্রতিরক্ষা ব্যয়-সবকিছু নতুন করে আলোচনায় আসবে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক লড়াইও।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট কত ব্যয় হতে পারে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বাস্তব ব্যয় বহুগুণ বেশি হয়। ইরানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অস্ত্রের ব্যবহার ও আঞ্চলিক জটিলতা ব্যয়কে আরও বাড়াতে পারে। এটি কৌশলগত অবস্থান, রাজনৈতিক সমর্থন, সামরিক মজুদ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
তাই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাবে, নাকি দীর্ঘ অভিযানের ভার নিয়ে আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষা করবে। তবে এ প্রশ্নের উত্তরটি নির্ভর করছে মার্কিন প্রশাসনের আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।

ইরান যুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের
মোসাদ্দেকুর রহমান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মাত্র কয়েক দিনেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। চলমান যুদ্ধ ও চরম উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্য এখন আবার বর্তমান-ভবিষ্যতের এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের সামরিক কৌশল শুধুই লক্ষ্য অর্জন করা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
সর্বশেষ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেতৃত্বের একটি রাজনৈতিক ভুল। কারণ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এতো বছর সামরিক অভিযান চালিয়েও তারা আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনা সদস্য বিমানে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আবার তাদের চিরাচরিত জীবনে ফিরে যায়, সামরিক অভিযান শুরুর আগে তারা ঠিক যেমন ছিল। এরপর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবে না, যা তাদেরকে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি করে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প নিজেই মধ্যপ্রাচ্যে আবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছেন।
যুদ্ধের ব্যয় ও বাস্তবতা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ২০২৬ সালের পুরো মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ০.১ শতাংশের সমান। অভিযানে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র ব্যাপক ব্যবহার এই আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রধান কারণ।

পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনই কোনো ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে ব্যয় ছাড়াতে পারে হাজার কোটি ডলার। কারণ ইরানের মতো শক্তিশালী এবং আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল অস্ত্রের ব্যবহারই নয়, বরং জ্বালানি, রসদ, সেনাঘাঁটি পরিচালনা—সবকিছুর সমন্বয়। এতে বলাই যায় যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জয়ী হলেও নিঃসন্দেহে আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন কার্যকরী, তেমনি ব্যয়বহুল। একটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার। একটি স্টেলথ বোমারু বিমানের একবারের মিশন পরিচালনার ব্যয়ও কয়েক মিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং বিমান অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে ব্যয় দ্রুতই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এসব অস্ত্রের উৎপাদন ব্যয়ই শুধু নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া, জ্বালানি, পাইলট প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের ব্যয় কয়েক শ মিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তান বা ইরাক যুদ্ধের সময় যেমন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কারণে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছিল, তেমনটি হলে ইরান অভিযানেও একই পরিণতি হতে পারে।

ইরানের পাল্টা হামলা বাড়াচ্ছে ব্যয়
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ইরানের পাল্টা আঘাতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা অপ্রস্তুত ছিল। অথবা তারা ভাবতে পারেনি যে এভাবে পাল্টা আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। এই পাল্টা আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।
ইরানের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, তারও আলাদা ব্যয় আছে। ইরানের একটি ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, তেলের দাম বেড়ে যায়। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব অন্য সবকিছুর ওপর পড়ে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে গিয়ে সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর প্রশ্নও উঠতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ চলাচল করলে প্রতিরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত পথ ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগেে। এতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

সামরিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক কার্যালয় পেন্টাগনের ভেতরে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে যুদ্ধ যদি ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে চাপ পড়তে পারে। প্যাট্রিয়ট, থাড বা নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল সিস্টেম প্রতিস্থাপন সময় সাপেক্ষ। এসব অস্ত্রের উৎপাদন সীমিত, আর তা বিশ্বব্যাপী মিত্রদের কাছে সরবরাহ করতে হয়।
এ ছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ যুদ্ধের ব্যয় ও কৌশল নিয়ে সরব। তারা ইরান যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে চান। এমনকি তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাত থেকে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ না থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর দীর্ঘায়িত যুদ্ধ মানেই বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। তখনও শুরুতে দ্রুত সাফল্যের আশা ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ জটিল হয়েছে, ব্যয় বেড়েছে, জনমত বদলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন—ইরানে দীর্ঘমেয়াদে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে।

‘ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের’
বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এই যুদ্ধ যদি এক বা দুই সপ্তাহে শেষ না হয়, তবে এর প্রভাব শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না-এটি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘ সংঘাতের দরুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি করবে।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যুদ্ধের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তাই মার্কিন কংগ্রেস এই ইতিহাসের শিক্ষাকে স্মরণে রেখে বর্তমান পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

জনমত ও রাজনৈতিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনমতও বিভক্ত। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সময়সীমা ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে উঠছে প্রশ্ন । যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে তবে অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
কংগ্রেসে বাজেট অনুমোদন, ঋণসীমা, প্রতিরক্ষা ব্যয়-সবকিছু নতুন করে আলোচনায় আসবে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক লড়াইও।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট কত ব্যয় হতে পারে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে বাস্তব ব্যয় বহুগুণ বেশি হয়। ইরানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অস্ত্রের ব্যবহার ও আঞ্চলিক জটিলতা ব্যয়কে আরও বাড়াতে পারে। এটি কৌশলগত অবস্থান, রাজনৈতিক সমর্থন, সামরিক মজুদ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল।
তাই এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাবে, নাকি দীর্ঘ অভিযানের ভার নিয়ে আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষা করবে। তবে এ প্রশ্নের উত্তরটি নির্ভর করছে মার্কিন প্রশাসনের আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।




