শিরোনাম

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২২৯৫, খাদ্যের জন্য হাহাকার

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২২৯৫, খাদ্যের জন্য হাহাকার
ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধার অভিযান। ছবি: এপি

গত সপ্তাহে আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ২৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১১ হাজার। আর নিখোঁজ রয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, ভূমিকম্পে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

এদিকে দেশটির ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে নিহতদের স্মরণে ৭ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, এত প্রাণহানিতে দেশের ‘আত্মা ক্ষতবিক্ষত’ হয়ে গেছে।

এর আগে বুধবার (২৪ জুন) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, প্রথম আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২। এর কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে। এর ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৭.৫। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ভেনেজুয়েলার ইউমারে শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এটি ছিল গত ১২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

জীবিতদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে দেশি-বিদেশি সংস্থা। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহর লা গুয়াইরার অধিকাংশ ধসে পড়া ভবনে ‘ডি (ডিসিস্ট)’ চিহ্ন দিয়ে রাখা হয়েছে। এর অর্থ, সেখানে তল্লাশি চালিয়ে জীবিত কাউকে পাওয়া যায়নি।

স্পেনের একটি উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কারী হাভিয়ের রোদেস বলেন, ‘যেখানে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেখানে সময় নষ্ট করা হয় না।’

তবে এর মধ্যেও ঘটছে অলৌকিক কিছু ঘটনা। ভূমিকম্পের ৬ দিন পর মঙ্গলবার (৩০ জুন) লা গুয়াইরা এলাকার ধ্বংসস্তূপ থেকে ক্লিয়েবার মোরান নামের তিন বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করে জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল। শিশুটিকে বের করে আনার সময় তাদেরকে উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায়।

সাধারণত এই ধরনের দুর্যোগের পর পরবর্তী তিন দিনই জীবিতদের খুঁজে বের করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। মানুষ পানি ছাড়া তিন দিনই বাঁচতে পারে। তারও অনেক পরে এই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা অলৌকিক ঘটনা বলা চলে।

খাদ্যের জন্য সংগ্রাম

দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া হাজারো মানুষ এখন তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। লা গুয়াইরার ১৮ বছর বয়সি বিক্রেতা দানিয়েলা আরমাস বলেন, ‘ত্রাণ দেওয়া হয়। কিন্তু খাবারের জন্য মানুষ প্রায় মারামারি করে। পরিস্থিতি যেন মোরগ লড়াইয়ের মতো।’

এত বড় দুর্যোগের পরেও চুরি ও লুটপাটের ঘটনাও বেড়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান জিনিস চুরির অভিযোগে বুধবার চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ভেনেজুয়েলা প্রধান লিয়া পোজ্জিও বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন।’

ত্রাণের জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন দিন দিন আরও বাড়ছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়া তরুণী আইসমার লোপেজ বলেন, ‘আমি যখন খাই, তখন মনে হয় কোথাও না কোথাও কেউ না খেয়ে আছে। তাই অপরাধবোধ হয়।’

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগামী তিন মাসে পাঁচ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি ডলার জরুরি তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।

এদিকে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত কারাকাসে উদ্ধার অভিযানে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর রাস্তায় ভেনেজুয়েলার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেলেও উদ্ধার অভিযানে তাদের তেমন দেখা যায়নি।

কারাকাসের পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা এল জুনকুইতোর এক বাসিন্দারা বলেছেন, উদ্ধার অভিযানে খুব কম সরকারি কর্মকর্তাকে দেখা গেছে। কৃষক ও অন্যান্য বাসিন্দাদের সরবরাহ করা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীই এখন দুর্গতদের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও সোমবার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট বলেন, ২৫ হাজারেরও বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ সদস্য ও সেনাসদস্য ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় কাজ করছেন।

জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো বলেন, শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পের পর ৫০০টিরও বেশি আফটারশক হয়েছে। এতে অন্তত ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে।

সূত্র: ফ্রান্স২৪, বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা

/জেএইচ/