শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

যেভাবে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
যেভাবে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার
ছবিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঊর্ধগতি বূঝানো হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি খাতের কাঠামোতেই স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে জ্বালানি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশগুলো এখন হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে। বিকল্প পাইপলাইন, স্থলভিত্তিক রপ্তানি অবকাঠামো এবং নতুন বাণিজ্যপথের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও জ্বালানি বিশ্লেষক আদি ইমসিরোভিচ বলেন, এই সংঘাতের পর তেলের বাজার আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। তাঁর মতে, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে।

যুদ্ধের পরও হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক জ্বালানি কোম্পানি বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক তাদের বিদ্যমান পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এসব অবকাঠামোর সম্মিলিত সক্ষমতা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল পরিবাহিত হতো, তার তুলনায় অনেক কম।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ঝুঁকির কারণে অনেক দেশ সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা সাইমন স্টিয়েল সম্প্রতি বলেছেন, এ সংঘাত বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে আরও দ্রুততর করছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইরেনা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং নতুন সংযোজিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বেশির ভাগই এসেছে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের ধারণা, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারও এ কারণে আরও দ্রুত বাড়বে। তেলের দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা অনেক দেশকে পরিবহন খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করছে।

অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এলহেদ্দাদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কিছু দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত বাড়াতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থনৈতিক সুবিধা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী হতে পারে চীন। বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত অধিকাংশ সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন এবং শক্তি সঞ্চয়কারী ব্যাটারি চীন উৎপাদন করে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা বাড়লে দেশটি আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মতো দেশগুলোও লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে এলএনজি রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহে কাতার নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ পাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—একক জ্বালানি উৎস বা নির্দিষ্ট রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে বৈচিত্র্য, নিরাপত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব আরও বাড়বে।

/এমআর/