শিরোনাম

পাহাড়ি ঢলে লন্ডভন্ড নেপাল, নিহত বেড়ে ১৬০

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
পাহাড়ি ঢলে লন্ডভন্ড নেপাল, নিহত বেড়ে ১৬০
নেপালে কাদা-পানির বিশাল স্রোত

আকস্মিক বন্যা আর ভূমিধসে লন্ডভন্ড দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল। বুধবার হিমালয়ের উচ্চভূমি থেকে শুরু হওয়া কাদা, পানি ও বরফের এক বিশাল স্রোত দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৬০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৭৫০ জন মানুষ। এর মধ্যে অন্তত ৪০০ জন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩৪ জন ভারতীয়, ৪৭ জন মার্কিনি, ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ার, ২৪ জন কানাডার এবং ১৯ জন মালয়েশিয়ার নাগরিক রয়েছেন। বাকি নিখোঁজ পর্যটকদের জাতীয়তা নির্ধারণে কাজ চলছে।

ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প হয়। এর ৩ মিনিটের মাথায় অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে এটা এখনও যাচাইয়ের অবকাশ রাখে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, নেপালের ভয়াবহ এই বন্যায় বহু সেতু ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। বহুতল ভবনগুলো উপড়ে পড়েছে। পালানোর চেষ্টাকালে প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া কয়েক ডজন পুরুষ, নারী ও শিশু তলিয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজু ভাদেল বলেন, বুধবার সকালে তার ভগ্নিপতি ফোন করে জানান, বন্যার পানিতে তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার ভাইয়ের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে নদীর তীরের বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। এএফপির ছবিতে কোথাও কাদামাটির নিচে চাপা পড়া বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে। আবার কোথাও নদীর পানি ও কাদায় বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে গেছে।

বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, দুর্যোগে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উদ্ধারকাজে নেপাল সেনাবাহিনীও যুক্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টার ও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।

নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলেও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় তিব্বতের গিরং এলাকায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ২৬৫ জন।

নেপাল সীমান্তের তিব্বতের একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এ ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

এদিকে দেশটির রসুয়া জেলার ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আতঙ্ক ছড়িয়েছে ভারতের বিহারে। রাজ্যটিতে হাই এলার্ট জারি করা হয়েছে। এছাড়াও মাইকিং, মানুষজনকে সতর্ক করার কাজ চলছে। ভোতে কোশি নদী হয়ে, ত্রিসুলী ও গণ্ডক নদী ধরে বিহারে প্রবেশ করতে পারে তিব্বতের পানি।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী উচ্চ লেভেল টিম গঠন করে সব সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী নদীর চারদিকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নদীর বাঁধ এবং বাঁধের চারপাশ বুধবার এবং বৃহস্পতিবার নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেন তিনি। বিশেষ করে রাতে নাইট পেট্রোলিং বাড়ানোর প্রতি জোর দেয়া হয়েছে।

গন্ডক নদীর পাশে থাকা পশ্চিম চম্পারন, পূর্ব চম্পারণ, মোজাফফরনগর, বৈশালী, গোপালগঞ্জ, সারণ জেলা প্লাবিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনকে হাই এলার্টে রাখা হয়েছে। রাজ্যের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং এসব দুর্যোগের তীব্রতাও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

নেপালে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীগুলোর উজানে এখনো বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে আছে।

এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে যেকোনো সময় আবারও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসতে পারে। ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

সূত্র: দ্য হিন্দু, নিউইয়র্ক টাইমস, কাঠমাণ্ডু পোস্ট

/জেএইচ/