শিরোনাম

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩
পানির তোড়ে অনেক জায়গায় আস্ত গ্রাম ভেসে গেছে

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪০৩ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে দেশটির পর্যটন বোর্ড। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শুরু হয়। নদীর পানি উপচে পড়ায় তীরবর্তী জনপদগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরো গ্রাম পানির স্রোতে ভেসে গেছে।

নেপাল পুলিশের স্থানীয় সময় বুধবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১, ধাদিংয়ে ১৮, চিতওয়ানে ৩৩, গোর্খায় ১৯, তানাহুঁতে সাত এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশটির পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। তাদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ ব্যক্তিরা ২৬টি দেশের নাগরিক। এ ছাড়া ৬১ জন নেপালি নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

ট্যুর অপারেটরদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশিদের বড় একটি অংশ ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজু ভাদেল (৫৬) বলেন, বুধবার সকালে তার ভগ্নিপতি ফোন করে জানান, বন্যার পানিতে তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার ভাইয়ের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে নদীর তীরের বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। এএফপির ছবিতে কোথাও কাদামাটির নিচে চাপা পড়া বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে। আবার কোথাও নদীর পানি ও কাদায় বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে গেছে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও বড় ক্ষতি

বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

পুলিশের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, দুর্যোগে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উদ্ধারকাজে নেপাল সেনাবাহিনীও যুক্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টার ও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।

তিব্বতেও প্রাণহানি

নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলেও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় তিব্বতের গিরং এলাকায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ২৬৫ জন।

নেপাল সীমান্তের তিব্বতের একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এ ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

ভূমিকম্পের পরই বন্যা, কারণ নিয়ে প্রশ্ন

হঠাৎ এই বন্যা ও ভূমিধসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, তিব্বত অঞ্চলে একটি ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকস্মিক বন্যা শুরু হয়।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটির পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা আরও যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং এসব দুর্যোগের তীব্রতাও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

আরও বন্যার আশঙ্কা

নেপালে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীগুলোর উজানে এখনো বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে আছে।

এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে যেকোনো সময় আবারও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসতে পারে। ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

/এমআর/