শিরোনাম

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় সার সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকরা

সিটিজেন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় সার সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকরা
ভারতে কৃষি শ্রমিক জমিতে সার ছড়াচ্ছেন। ছবি: আল জাজিরা

ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের কৃষকের জীবনযাত্রায়। গোটা অঞ্চলজুড়ে সারের ক্রমবর্ধমান দাম ও ঘাটতিতে কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি আর যুদ্ধাবস্থা এখন আর দূরদেশের সংবাদ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে সারের বাজারে আগুন লেগেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জেরে ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার তৈরির প্রধান উপাদান এলএনজি মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই আসে, যার এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হাজার মাইল দূরের এ যুদ্ধ এখন পাঞ্জাবের গমক্ষেত থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রংপুরের ধানি জমিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের গুরদাসপুরের কৃষক রমেশ কুমারের মতো লাখো মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সারের আকাশচুম্বী দাম আর সরবরাহ সংকটে তার সামনে এখন বড় প্রশ্ন ফসলের খরচ জোগাবেন নাকি মেয়ের বিয়ে দেবেন?

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের প্রধান খাদ্য ধান ও গমের উৎপাদন সরাসরি সারের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের প্রায় ১০ কোটি কৃষক পরিবার সরাসরি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং দেশটির কৃষি উপকরণের প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। একই অবস্থা পাকিস্তানেও, যেখানে ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) আমদানির বড় অংশই এ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে সারের দাম বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সাধারণ কৃষকদের ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলছে।

বাংলাদেশের কৃষি খাতও সংকটের বাইরে নয়। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১২ শতাংশের বেশি হলেও সার আমদানির জন্য দেশটিকে বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ায় রংপুরের কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিমদের মতো প্রান্তিক চাষিরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না, আর পেলেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার মরক্কো ও চীনের মতো বিকল্প বাজার থেকে সার আমদানির চেষ্টা করছে এবং ৫ লাখ টন ইউরিয়া সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। নেপাল ও কাশ্মীরের কৃষকরাও জানিয়েছেন, প্রকৃত সারের সংকট হওয়ার আগেই বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি দেখে তারা সারের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন, যা সরাসরি ফসলের ফলন কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল জনগোষ্ঠী এখন ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে। যদিও ভারত-পাকিস্তানের সরকারি মহল থেকে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন বীমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই আশ্বাস কৃষকদের মন থেকে আতঙ্ক দূর করতে পারছে না। সারের অভাব মানেই উৎপাদন হ্রাস এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের খাদ্য সংকট। ভূ-রাজনৈতিক দাবার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বলির পাঁঠা হচ্ছেন রমেশ কিংবা ইব্রাহিমদের মতো সাধারণ কৃষকরা, যাদের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির নীল জলরাশি আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণের ওপর।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/