শিরোনাম

খাদ্যাভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে দেশের ৭০ শতাংশ শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
খাদ্যাভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে দেশের ৭০ শতাংশ শিশু
কোলাজ: সিটিজেন গ্রাফিক্স

দেশে দরিদ্রতা ও সচেতনতার অভাবে অপুষ্টি সমস্যা নিরসনে কার্যকর উন্নতি হয়নি। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য না পাওয়ায় অপুষ্টিতে ভুগছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক যৌথ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঝুঁকি যেসব শিশু

অপুষ্টি কমাতে দীর্ঘদিন ধরে দেশে নানা কর্মসূচি পালন করছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। তবে নানা কারণে ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য পাচ্ছে না দেশের ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন শিশু। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।

ইউনিসেফের মতে, ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ বলতে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের বৈচিত্র্য এবং কতবার খাওয়া হচ্ছে তার একটি সর্বনিম্ন মানদণ্ডকে বোঝায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর প্রথম দুই বছর শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না গ্রহণ করলে শিশুরা স্থায়ীভাবে খর্বাকৃতি, কম ওজন, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কম মেধা নিয়ে বেড়ে ওঠে।

শহর ও গ্রাম: সবখানেই খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতার অভাব

প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও দেশের গ্রাম ও শহরে শিশুদের মা এবং যত্নদাতাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

জরিপে দেখা যায়, জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যেই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র ৩০ শতাংশ। এই চিত্রকে শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া জন্ম থেকে ৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৭ শতাংশ। ৬ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের কঠিন বা আধা কঠিন খাবার পাওয়ার হার ৭৮ শতাংশ। তবে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ ‘ন্যূনতম খাদ্যবৈচিত্র্য’ এবং ৩০ শতাংশ ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য পাচ্ছে। যাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

জরিপে আরও দেখা যায়, যথাযথ জ্ঞানের অভাবে মাতৃদুগ্ধ থেকে স্বাস্থ্যকর সম্পূরক খাদ্যে রূপান্তর অনেক ক্ষেত্রে সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না। এই অসচেনতার কারণে শিশুদের খর্বাকৃতি, ক্ষয় ও অপুষ্টিজনিত নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি অপুষ্টিতে রয়েছে দেশের গ্রাম ও দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। তবে স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে শহর এবং সচ্ছল পরিবারের শিশুরাও প্রস্তাবিত খাদ্যবৈচিত্র্য অনুযায়ী খাবার পায় না।

ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্যের মানদণ্ড

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য’ বলতে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুকে অন্তত ৫টি খাদ্যগোষ্ঠীর খাবার দিতে হবে। যেমন- শস্য, ডাল, সবজি, ফল, দুধ ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, বয়স অনুসারে শিশুদের নির্দিষ্ট সংখ্যকবার খাবার দিতে হবে। মায়ের দুধের পাশাপাশি ৬ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের দিনে অন্তত দুবার এবং ৯ থেকে ২৩ মাস বয়সীদের দিনে তিনবার ১ থেকে ২টি হালকা খাবার খওয়াতে হবে।

প্রথম ২ বছরে যথেষ্ট পুষ্টি না পেলে ব্যাহত হয় শিশুর বৃদ্ধি

শিশুর জন্মের পর প্রথম দুই বছর তার বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কে ইংরেজিতে ‘ক্রিটিক্যাল গ্রোথ উইন্ডো’ (বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়) বলা হয়। এই বয়সসীমার মধ্যে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পেলে শিশুরা খর্বাকৃতির হয়। এছাড়া ওজন-স্বল্পতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি তাদের মেধা, স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ২৪ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির। যা ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য না পাওয়ার কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদেরা।

বিশ্বব্যাপী পুষ্টি পরিস্থিতির শীর্ষ স্বাধীন মূল্যায়ন ‘দ্য গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, শিশুদের ‘বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়’ সাধারণত জন্মের পরের প্রথম ১০০০ দিনকে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে শিশুর জন্মের পর প্রায় দুই বছর পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে শিশুদের যাবতীয় বিকাশ অনেকটাই পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত উপাদানের ওপর নির্ভরশীল।

প্রয়োজন কঠোর নজরদারি

এসব ঝুঁকি নিরসনে কঠোর নজরদারির নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এমআইসিএসের (২০২৫) তথ্য অনুযায়ী, শহর-গ্রাম ও ধনী-গরিব সব ক্ষেত্রেই শিশুদের খাদ্যবৈচিত্র্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। দেশের গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৩৩ শতাংশ শিশু প্রস্তাবিত ন্যূনতম খাদ্যবৈচিত্র্য পাচ্ছে। আর শহরে সেটার হার মাত্র ৪২ শতাংশ। এমনকি ধনী পরিবারের শিশুদের খাদ্যবৈচিত্র্য নিশ্চিতের হারও তুলনামূলক কম, ৪৭ শতাংশ। তবে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা ২৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক পরিবার শিশুর খাদ্যে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য বজায় রাখতে পারছে না। তবে পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর অপুষ্টির পেছনে আর্থিক সমস্যা ছাড়াও ফ্যাট জাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা, সচেতনতার অভাব, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখছে।

সমন্বয়হীনতায় ভুগছে সরকারি উদ্যোগ

জাতীয় পুষ্টিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সমন্বয় এবং পুষ্টি খাতের নীতি উন্নয়নে কাজ করে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশে পুষ্টি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫টি মন্ত্রণালয়। যাদের ১৩টি সরাসরি পুষ্টিসম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়ে ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুল আরেফিন জানান, শিশুর একটি বৃহৎ অংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার পাচ্ছে না– বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। দুর্বল পরিকল্পনা ও মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই অপুষ্টি দূর করার পথে বড় বাধা।

বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের (বিএনএনসি) মহাপরিচালক ডা. মো. রিজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘পুষ্টিসম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনাকারী মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি এবং এটি আরও জোরদার করার চেষ্টা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের খর্বাকৃতি ও ওজন-স্বল্পতা কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তবে ২০১৫ সালের জাতীয় পুষ্টিনীতি আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া সমন্বয় জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

/এফআর/