শিরোনাম

প্রশাসনের অবহেলায় ভয়ংকর রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রশাসনের অবহেলায় ভয়ংকর রূপ নিতে পারে ডেঙ্গু
ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা।

মৌসুম শুরুর আগেই দেশজুড়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের ২৭ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময় প্রায় ছয় হাজার মানুষের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই রাজধানীর বাইরের বাসিন্দা। বরিশাল ও খুলনা বিভাগে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

গত বছরও এসব বিভাগসহ দেশের ৩২ জেলায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ছিল। আর গত বছর দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এ সময় রোগটিতে মারা যান ৪১৩ জন। এর মধ্যে আট জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল ভয়াবহ; রোগী ছিল ২ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। এবার নতুন করে সাত জেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। ফলে এসব জেলার স্থানীয়রাও এবার ডেঙ্গু নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে। কিছু জেলায় আমরা লার্ভার ঘনত্ব বেশি পেয়েছি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি, সেখানে কোথাও কোথাও ঘনত্ব অনেক বেশি।’

গত বছরের নভেম্বরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি জরিপে দেখা যায়, বরগুনাসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বড় পাত্র থেকে এডিস মশা, পানির সংকটের কারণে বংশবিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল।

এদিকে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় গত ২ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ বেড ফাঁকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্টে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে। শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হবে।

কিন্তু কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে। এর মধ্যে আবার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। তবে এ বছর প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে ডিএসসিসি। জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনে কাজ করবে বলে জানা গেছে।

তবে নগরবাসীর অভিযোগ, নগরীর অনেক এলাকায় নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। কোথাও কোথাও কয়েকদিন পরপরও ওষুধ ছেটানো হচ্ছে না। ফলে এডিস মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কীটতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং তা ভয়াবহ হতে পারে। আগামী এক মাসের মধ্যে এডিসের বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। এসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন জরুরি।

তবে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলামের দাবি, ‘মশা বেড়ে গিয়েছিল, আমাদের মনিটরিং টিমটা, আমাদের কর্মকর্তা দিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ মোটামুটি এখন ভালো কমাতে পেরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফগিংটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা একটু মনোযোগ দিচ্ছি, মশককর্মীরা যেন একটা ভালোভাবে ব্যবহার করে। এজন্য মনিটরিং টিমটা আমরা দিয়েছি। অনেকটাই মশা কমেছে।’

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত নগরায়ণ দরকার। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি নগর পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় না হবে ততক্ষণ শুধু কেমিক্যাল দিয়ে ফগিং করে কোনো লাভ হবে না।’

/এফআর/