শিরোনাম

ঘুমাতে গেলেই কেন মনে পড়ে অতীতের বিব্রতকর মুহূর্ত

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
ঘুমাতে গেলেই কেন মনে পড়ে অতীতের বিব্রতকর মুহূর্ত

দিনভর কাজের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। চোখ বুজে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখনই হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা। হয়তো সবার সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার মুহূর্ত, কোনো ভুল কথা বলে বিব্রত হওয়ার স্মৃতি কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতি, যা মনে পড়লেই এখনও অস্বস্তি লাগে। প্রশ্ন হলো, এত বছর পরেও কেন এসব স্মৃতি ফিরে আসে?

মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা মতে, এমন ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল এড়িয়ে চলতে সহায়তা করে।

দিনের বেলায় মানুষের মস্তিষ্ক নানা কাজ, সিদ্ধান্ত ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যস্ত থাকে। ফলে অতীতের ছোটখাটো স্মৃতিগুলো সামনে আসার সুযোগ পায় না। কিন্তু রাতে যখন চারপাশ শান্ত হয়ে আসে এবং কাজের চাপ কমে যায়, তখন মস্তিষ্কের একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যাকে ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ বলা হয়, সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই নেটওয়ার্ক অতীত অভিজ্ঞতা, অসম্পূর্ণ চিন্তা এবং আবেগঘন স্মৃতিগুলো পর্যালোচনা করতে শুরু করে। যে ঘটনাগুলো আমাদের মনে বেশি দাগ কেটেছে, সেগুলোই তখন বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে বহু পুরোনো বিব্রতকর মুহূর্তও হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

মানুষের মস্তিষ্কে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘নেগেটিভিটি বায়াস’। এর ফলে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার তুলনায় নেতিবাচক বা অস্বস্তিকর ঘটনাগুলো বেশি শক্তভাবে মনে গেঁথে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিবর্তনগতভাবে মানুষের টিকে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ অতীতে কোনো ভুল বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি মনে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে সেই ঝুঁকি এড়ানো সহজ হয়। তাই মস্তিষ্ক অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলোকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে।

কখনও কি লক্ষ্য করেছেন, কোনো পুরোনো ঘটনার কথা মনে পড়ার পর সেটি নিয়েই দীর্ঘ সময় ধরে ভাবতে থাকেন? মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে বলা হয় ‘রুমিনেশন’। এ সময় মস্তিষ্ক একই ঘটনার বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে। অনেকেই মনে মনে ভাবেন, ‘সেদিন যদি অন্যভাবে বলতাম’ বা ‘ওভাবে না করে এভাবে করলে ভালো হতো।’ মূলত ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যই মস্তিষ্ক এমন বিশ্লেষণ চালিয়ে যায়।

বিব্রতকর স্মৃতি ফিরে এলে অনেকের মনে হয়, আশপাশের সবাই হয়তো এখনও সেই ভুলের কথা মনে রেখেছে। বাস্তবে বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সত্য নয়। মনোবিজ্ঞানে ‘স্পটলাইট ইফেক্ট’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর ফলে মানুষ মনে করে, অন্যরা তার আচরণ, ভুল বা বিব্রতকর মুহূর্তকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ নিজেদের জীবন ও সমস্যা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে আপনার মনে গেঁথে থাকা ঘটনাটি অন্যদের স্মৃতিতে হয়তো আদৌ নেই।

মানসিক চাপ বা উদ্বেগের মাত্রা বেশি থাকলে অতীতের নেতিবাচক স্মৃতিগুলো আরোও ঘন ঘন মনে পড়তে পারে। কারণ স্ট্রেসের সময় শরীরে কর্টিসল নামের হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা আবেগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় মস্তিষ্ক ইতিবাচক অভিজ্ঞতার চেয়ে নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে পুরোনো অস্বস্তিকর স্মৃতিও বারবার ফিরে আসতে পারে।

ঘুমানোর আগে পুরোনো বিব্রতকর মুহূর্ত মনে পড়া বিরক্তিকর হলেও এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক অতীত অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করে।

তবে মনে রাখা জরুরি, যে ঘটনাটি নিয়ে আপনি এখনও বিব্রত বোধ করেন, সেটি হয়তো অন্য কেউ আর মনে

রাখেনি। তাই অতীতের ছোটখাটো ভুল নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে সেগুলোকে জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করাই ভালো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব স্মৃতির তীব্রতাও কমে আসে।

/এসবি/