শিরোনাম

নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচারে খরচ করল ৪৬ কোটি টাকা

নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচারে খরচ করল ৪৬ কোটি টাকা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেড নামের এক প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘ফেস্টিভ্যাল ইলেকশন ক্যাম্পেইন ২০২৫–২০২৬’ শীর্ষক কাজটি পায়। ঢাকার ডুমনী এলাকায় নামসর্বস্ব অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার ঝুলিও ফাঁকা। অনেক বিজ্ঞাপনী সংস্থা যখন দীর্ঘদিন কাজ করেও এক কোটি টাকার কাজ পায় না। সেখানে এই অপরিচিত প্রতিষ্ঠান অল্প সময়ে বিপুল অঙ্কের টাকার কাজ পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের এক নেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের অর্ধশত স্বনামধন্য বিজ্ঞাপনী সংস্থার তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম নেই। অথচ নির্বাচনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রচারণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে। অপরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি কার সহায়তায় এবং কীভাবে এই বিপুল অঙ্কের টাকার কাজ পেয়েছিল তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।

বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত। এটির পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে এরশাদুল হক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে গিয়ে তারা কী কী সেবা দিয়ে খাকে এবং ইতোমধ্যে তারা কোন ধরনের ব্র্যান্ড প্রমোশন ও প্রচারাভিযানের কাজ করেছে তার একটি তালিকা পাওয়া গেছে। তবে চেয়ারম্যান বা এমডি হিসেবে কারা আছেন তাদের নাম এখানে নেই। যোগাযোগের জন্য শুধু একটি মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে , গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণায় ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪৬ কোটি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৭২ কোটি এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় (তথ্য, ধর্ম, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক) মিলে আরও প্রায় ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দুটি ভাগে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানকে প্রচারণার কাজ দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালে অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড যাত্রা শুরু করে । প্রতিষ্ঠানটি কর্পোরেট খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণার কাজ করে বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

গত সোমবার (১৫ জুন) সকাল ১০টার দিকে অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ডের ওয়েবসাইটে দেওয়া ঠিকানা খিলক্ষেতের ডুমনী এলাকায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু শুরুর দিকে তারা এটির অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। কিছু সময় খোঁজাখুঁজির পর ওই এলাকার ডুমনী ক্লাবের পূর্ব পাশে একটি বাড়িতে প্রতিষ্ঠানটির অফিসের সন্ধান পাওয়া যায়। বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী আরাফাতের কাছে ওই প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গেট খুলে দেন। তবে ওই বাড়ির সামনে অ্যাডভান্স হোয়াইপবোর্ডের কোনো সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড দেখা যায়নি। অফিসের আশপাশের চিত্র দেখে যে কারও মনে হবে, স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় হওয়ার উপযোগী নয়।

বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একটি সরকারি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার ব্যানার লাগানো একটি ট্রাক। সেখানে কথা হয় মিজান নামে অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ডের এক কর্মচারীর সঙ্গে। অফিসের ভেতরের পূর্বপাশে একটি সোফা। রয়েছে আরও কয়েকটি চেয়ার। অফিসের পশ্চিম অংশ কাঁচ দিয়ে ঘেরা। সেখানে কয়েকটি কম্পিউটারে কয়েকজনকে কাজ করতে দেখা যায়।

কথা প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় কারা রয়েছেন জানতে চাওয়া হলে মিজান বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে এখানে এসেছি। কর্মচারী রনি মালিকদের সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।’ তবে রনি ওই সময়ে অফিসে ছিলেন না।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে গত বছরের ২৯ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জনসচেতনামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যথাযথ বিধি অনুসরণ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়।

অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ডের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলা ও ৩০০টি উপজেলায় গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে প্রচারণা চালানো হয়। এজন্য ৩০টি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৯ কোটি ৯৬ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ডের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলা ও ৩০০টি উপজেলায় গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে প্রচারণা চালানো হয়। এজন্য ৩০টি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৯ কোটি ৯৬ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা।

এ ছাড়া অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড ৮টি সুপার এলইডি ক্যারাভানের মাধ্যমে ৫৩টি জেলার ১৭২টি উপজেলার ২৬৯টি স্থানে এবং ২২টি রেগুলার এলইডি ক্যারাভানের মাধ্যমে ৬৪ জেলার ৩৫৯টি উপজেলার এক হাজার ১১৫টি স্থানে প্রচার চালায়। এজন্য ব্যয় ধরা হয় ২৬ কোটি টাকা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রচারণায় নামসর্বস্ব একটি প্রতিষ্ঠানকে ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ইউনুস সরকার ভাগ-বাটোয়ারার জন্য এই ধরনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছে। এই কাজের ভাগ তাদের পকেট ছাড়াও বিভিন্ন জনের কাছে গেছে। এটিও খুঁজে বের করা দরকার।’

এ বিষয়ে অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমডির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক এসএম ফয়সাল রহমান বলেন, ‘এটি পুরোনো বিষয়। এই বিষয় নিয়ে আপনার এত ইন্টারেস্ট কেন। প্রতিষ্ঠান সব নিয়ম-কানুন মেনেই কাজ পেয়েছে।’

অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেডকে নির্বাচনের প্রচারণ কাজ দেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এবং পারচেজ কমিটি সিদ্ধান্তে সকল নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো অনিয়ম খুঁজে পেলে সেটি অনুসন্ধান করে দেখার অধিকার আপনাদের রয়েছে।’

অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এএএবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিট্রেন্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনির আহমেদ খান বলেন, 'এই পেশায় আমি গত ৪২ বছর ধরে কাজ করছি। কিন্তু অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কখনো শুনিনি। আমরা অনেক চেষ্টা করেও এক কোটি টাকার কাজ পাই না। এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে ৪৬ কোটি টাকার কাজ পেল সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।’

অ্যাডভান্স হোয়াইটবোর্ড লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনার কিছু জানার থাকলে মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞাসা করুন। এই মুহূর্তে আমি একটি মিটিংয়ে ঢুকবো।’ অর্থাৎ সাবেক উপদেষ্টা যথাযথ উত্তর না দিয়ে কৌশলে প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণায় কোন প্রতিষ্ঠানকে কী উপায়ে কাজ দেওয়া হয়েছে তা আমি জানি না। সে সময়ে আমি এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম না। আপনার কিছু জানার থাকলে মন্ত্রণালয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে পারেন।’

/বিবি/