শিরোনাম

সচিবালয় থেকে অফিসার্স ক্লাব : গণপূর্তের ইএম বিভাগে ‘নয়-ছয়ের’ গল্প

বিশেষ প্রতিনিধি
সচিবালয় থেকে অফিসার্স ক্লাব : গণপূর্তের ইএম বিভাগে ‘নয়-ছয়ের’ গল্প
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশ্রাফুল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী (গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-২) কাজী মাশফিক আহমেদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী (গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৪) নিয়াজ মোহাম্মদ তানভীর। কোলাজ সিটিজেন জার্নাল

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক দিন। জাতীয় সংসদে তখন অধিবেশন চলছে। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ডুবে গেলো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা—সংসদ ভবন। সংসদ সদস্য, কর্মকর্তা, নিরাপত্তা কর্মী—সবার চোখেমুখে আতঙ্ক। এক মিনিট কিংবা দুই মিনিট নয়, টানা ৪৫ মিনিট অন্ধকারে ছিল সংসদ ভবন। কেপিআইভুক্ত এই ভবনে এমন বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুধু অব্যবস্থাপনা নয়—এটি ছিল বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও।

সেই ঘটনার গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) আশ্রাফুল হককে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু করিৎকর্মা এই প্রকৌশলী থেমে থাকার পাত্র নন। তিনি গণভবনেরও দায়িত্বে গিয়ে আরেক বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেন। একটি স্থাপনায় মেরামতের জন্য ১৮ কোটি টাকার ক্যাবল কেনার প্রস্তাব করেন। এমন অবাস্তব কাণ্ডে তৎকালীন প্রশাসক ক্ষেপে গিয়ে প্রকৌশলী আশ্রাফুলকে শাস্তিমূলকভাবে চট্রগ্রামে বদলি করেন। কিন্তু এখানে গল্পের শেষ নয়।

জাতীয় সংসদ
জাতীয় সংসদ

এমন বহু ঘটনার কখনো সরাসরি কখনো নেপথ্য নায়ক আশ্রাফুল হক এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে। যিনি একটি ডিভিশনের দায়িত্ব পেয়ে অবহেলা আর লুটপাটে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি এখন পুরো সংস্থার ইএম বিভাগের দায়িত্বে গিয়ে কতটা সহনীয় হয়েছেন তা দেখার বিষয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সচিবালয়ের আগুন এবং দায়

বাংলাদেশ সচিবালয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এতে বলা হয়, ইএম বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের গাফিলতির কারণেই অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন মনে করা হয়েছিল, এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মোহাম্মদ তানভীর আলম বদলি হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দায়িত্বেই থেকে যান। সেখানে পূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম ও তৎকালীন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানকে ম্যানেজ করে টিকে যান এ প্রকৌশলী। রক্ষনাবেক্ষণের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজও দেন আদিলুর রহমানের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত লোকজনকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত (ই/এম বিভাগ-৪) নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মোহাম্মদ তানভীর আলম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইএম বিভাগের পক্ষ থেকে চারটি লিফট স্থাপন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং ভবনে ওয়্যারিংয়ের খরচ বাবদ সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

দরপত্র ছাড়াই সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ

দরপত্র আহ্বান ছাড়াই সচিবালয়ে একটি ভবনের অংশে সৌন্দয্য বর্ধনের কাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। শুরুতে এই কাজের বড় অংকের বাজেট নির্ধারণ করলে সমালোচনার মুখে বাজেটের পরিমাণ অর্ধেকের কম নেমে আসে বলে জানা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভবনের পেছনের অংশে সরবরাহ লাইনের পাইপগুলো ভবনটির বাইরে দৃশ্যমান ছিল। সে অংশটিতে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করা হয়।

সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মনস্ত্রণালয়ের ভবনে  সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মনস্ত্রণালয়ের ভবনে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

অ্যালোমিনিয়ামের পাত এবং লোহার তার দিয়ে পাইপগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মাঝখানে কৃত্রিম দূর্বাঘাস ও পাতা দেওয়া হয়েছে। আড়াই থেকে তিন ফুট চওড়া চারটি এবং পাঁচ ফুট চওড়া একটিসহ সব মিলিয়ে পাঁচটি স্থানে সৌন্দয বর্ধনের কাজ করা হয়েছে। কমবেশি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার কাজে এখনো দরপত্র আহবান করা হয়নি। গত ১৫ বছর ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরে একচেটিয়া কাজ করা প্যারাডাইম নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি গত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে চাপে পড়লেও এর তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সার্কেল-২ ) আবু নাসের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ। এই কারণ আবার তারা পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন।

জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী (ইডেন গণপূর্ত বিভাগ) মুনতাসির মামুন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের জন্য ১৮–২১ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। এই বিষয়টি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ভালো বলতে পারবেন।’ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী তানজিল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক প্রাক্কলন ব্যয় ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। কাজটি জরুরী হওয়ায় তা দ্রুত সাব-কন্টাক্ট্রের মাধ্যমে একজন ঠিকাদার দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।’

সচিবালের অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং নতুন উপকরণ কেনসহ এ সংক্রান্ত কাজে ৩২ কোটি টাকা খরচের আয়োজন করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে পরিবহন পুল, সচিব নিবাস, মন্ত্রী পাড়া এবং সচিবালয়ের কয়েকটি ভবন।

চলমান বৈশ্বিক সংকটে দেশের অর্থনীতি যখন স্থবির এ সময়ে এ ধরনের অর্থ খরচের আয়োজনকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।

অফিসার্স ক্লাব প্রকল্প

অফিসার্স ক্লাব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জুনে। সেই অনুযায়ী ঠিকাদারকে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, প্রকল্প শেষ হওয়ার ৮ মাস পরেও কাজ চলমান রয়েছে। ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মধ্যে নিয়মবর্হিভূত আঁতাতেই চলছে বড় আর্থিক ঝুঁকির এ কাজ।

রাজধানীর বেইলি রোডে ঢাকা অফিসার্স ক্লাব। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর বেইলি রোডে ঢাকা অফিসার্স ক্লাব। ছবি: সংগৃহীত

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী (গণপূর্ত ইএম বিভাগ-২) কাজী মাশফিক আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দরপত্রে কারসাজি

মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এর মধ্যে ১৫টি মতিঝিলে ও ৫৩টি আজিমপুরে স্থাপন করা হবে। ই-জিপি, সিপিটিইউ (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট), গণপূর্তের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওই দরপত্র আহ্বান করা হয় ।

৬৮টি লিফটের দরপত্র মোট ১২টি লটে আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় ড্যাফোডিল ইলেকট্রনিক্স, হরিজন টেকনোলজিস, রওশন এলিভেটরস এবং প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। সবকটি লটে একমাত্র রওশন এলিভেটরসই সর্বনিম্ন দর দিয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

গত কয়েক বছরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক বাতি বসানোর নামে বিপুল পরিমান টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। বিষয়টি সরকারি নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংসদের অন্ধকার, সচিবালয়ের আগুন, মন্ত্রীপাড়ার ব্যয়, দরপত্রে অভিযোগ—সব মিলিয়ে একটি প্রশ্ন এখন সামনে দাঁড়িয়ে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত?

/বিবি/