শিরোনাম

কর্তৃপক্ষের সুনজরে আসামি হয়েও দাপুটে কর্মকর্তা তারা

কর্তৃপক্ষের সুনজরে আসামি হয়েও দাপুটে কর্মকর্তা তারা
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) স্থপতি মো. তাওফিকুজ্জামান। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি আলোচিত মামলার আসামি হয়েছেন তিনি। এরপরও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তিনি এখনো জাগৃকের নকশা সৃজন ও পাসের কাজ করে যাচ্ছেন। আরেক মামলার আসামি প্রকৌশলী আবু হানিফ। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর (চট্টগ্রাম জোন) দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজউকের পরিচালক হিসেবে কর্মরত কামরুল ইসলাম। বিসিএস ২৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার নামেও দুদকে মামলা আছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ খাদেম ও নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুলাহ মো. জোবায়ের এখনো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। দুদক থেকে মামলা সংক্রান্ত নথিপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হলেও এসব আসামির বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তবে ভিন্ন চিত্রও আছে– দুদকের মামলার আসামি হয়ে এই মুহূর্তে সাময়িক বরখাস্ত আছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে। বিশেযজ্ঞরা মনে করেন, অভিযোগ ওঠার পরও এভাবে কর্মকর্তাদের স্বপদে বহাল রাখার বিষয়টিকে লুটপাট এবং নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রকাশ্যে প্রশয় দেওয়ার শামিল।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘দুদকের মামলা দুই ধরনের। প্রথমে তারা এফআইআর (প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন) করে। তারপর তদন্ত করে অভিযোগপত্র দিলে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। তবে, তদন্তের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির পদ বহাল থাকলে তদন্তের ব্যঘাত ঘটতে পারে বা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।’ কর্তৃপক্ষ মনে করলে তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারেন বলে জানান তিনি।

  • রাজউক, গণপূর্ত, জাগৃকের একাধিক কর্মকর্তা অভিযুক্ত হয়েছেন
  • কর্মকর্তাদের দাপটে আইন কার্যকর হয় না
  • মামলার পরে দেনদরবার করে অনেকেই বেরিয়ে যান

জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনকে দুর্নীতি ও দলীয়মুক্ত করার অংশ হিসেবে গত দেড় বছরে দুদক ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বেশকিছু সরকারি কর্মকর্তাকে নানা অনিয়মের ঘটনায় অভিযুক্ত করেছে।

ফৌজদারি মামলায়ও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না

তবে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গুরুতর ফৌজদারি ও দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়েও অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসছে নানা কৌশলে তাদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। আবার সংস্থা প্রধানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা নানা অপরাধমূলক ও বেআইনি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করে কাগজ যাচাই না করা ও মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন না করেই ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন এবং নির্মাণ অনুমতি প্রদানের অভিযোগে গত ২২ জানুয়ারি ৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও স্ত্রী, ছেলেসহ তার পরিবার এবং রাজউকের ৩৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। এই আসামিদের অনেকেই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন না করে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের আবেদনে ব্যবহৃত রেকর্ডপত্র ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেনি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ভূমি পরিদর্শন না করে পরস্পর যোগসাজস, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে ভূমি সংস্কার বোর্ড ‘কোডস অব ওয়ার্ড’-এর নামে খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি এবং অভিযোগকারীদের সম্পত্তি যাচাই না করে রুপায়ন হাউজিং এস্টেটের নামে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

দুদকের মামলার আসামি রাজউক কর্মকর্তারা

এই মামলার আসামিদের মধ্যে এখনো রাজউকে কর্মরত আছেন রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল করিম, কামরুল হাসান সোহাগ, এমদাদুল হক মুনসী, এমরান হোসেন সুমন, অথরাইজড অফিসার মো. আশরাফুল ইসলাম আহমেদ, জান্নাতুল নাইমা, তামান্না বিনতে রহমান, এস এম এহসানুল ইমাম ও মো. খায়রুজ্জামান, প্রধান ইমারত পরিদর্শক আবু শামস রকিব উদ্দিন আহমেদ, পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম, ইমারত পরিদর্শক মো. মাসুদুর রহমান, সহকারী পরিদর্শক (এস্টেট ও ভূমি) জ্ঞানময় চাকমা, এস্টেট পরিদর্শক তৌফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের আনন্দ কুমার বিশ্বাস এখনো কর্মরত আছেন।

জানা যায়, গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। গত ৪ জানুয়ারি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে স্বপদে বহাল রেখেছেন। বিভিন্ন অনিয়ম ও ভুয়া নথিপত্রের মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ব্রডওয়ে রিয়েল এস্টেট লিমিটেড ৪৯০ কোটি টাকা, মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ৩০০ কোটি টাকা এবং প্রকৃতি অ্যাসোসিয়েটস ৮০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে আত্মসাৎ করেছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করা হয়েছে। এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষক হিসেবে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

হত্যা মামলার আসামি পুলিশ কর্মকর্তারা বহাল

জুলাই আন্দোলনের জেরে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ডিআইজি ও এসপি পদমর্যাদার অন্তত ১২০ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিআইডি অর্থপাচারের তথ্য পেয়েছে। এসব ঘটনায় হওয়া মামলায় কিছু কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেও অনেক অভিযুক্ত কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে বা দপ্তরে আছেন।

বিগত সরকারের সময় নানা অনিয়মে জড়িত থাকা অন্তত ১৫ জন সচিব এবং অর্ধশতাধিক অতিরিক্ত ও যুগ্মসচিবের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, মেগা প্রজেক্ট থেকে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এদের অনেককে ওএসডি করা হলেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্ষদে তাদের প্রভাব এখনো আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিন্ডিকেট এখনো বহাল

রাজউক, সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, এনবিআর, কাস্টমস, এলজিইডি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো সংস্থাগুলোতে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা কর্মকর্তারা এখনো বহাল। এসব সরকারি দপ্তরের অন্তত ২০ জন প্রকৌশলীসহ একাধিক কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। অথচ তারা নিয়মিত অফিস করছেন এবং প্রশাসনিক ফাইলে সই করছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযুক্তদের স্বপদে বহাল থাকার পেছনে আইনি জটিলতা ও ‘সার্ভিস রুলস’-এর মতো কিছু বিষয় কাজ করছে। সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা গ্রেপ্তার না হচ্ছেন বা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল না হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে সরাসরি বরখাস্ত করা যাচ্ছে না। এই আইনি সুযোগটি নিচ্ছেন অভিযুক্তরা।

আরেকটি বিষয় হলো- স্বপদে বহাল থাকার সুযোগে অনেক কর্মকর্তা দাপ্তরিক নথিপত্র সরিয়ে ফেলছেন বা ডিজিটাল এভিডেন্স (তথ্য-প্রমাণ) নষ্ট করছেন, যা দুদক ও সিআইডির তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করছে। সেই সঙ্গে প্রশাসনের একটি বড় অংশকে হঠাৎ সরিয়ে দিলে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থবিরতা আসতে পারে এমন কারণেও অনেক ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চেয়ারে রেখে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার সৃষ্টি হয়। মামলার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো উচিত।

অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চেয়ারে রেখে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার সৃষ্টি হয়। মামলার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো উচিত।

সরকারের সাবেক সচিবদের মতে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের স্বপদে রাখা বর্তমান সরকারের জন্য ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে। তারা বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা প্রশাসনে থেকে তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে পারেন কিংবা সংস্কার প্রক্রিয়াকে ভেতর থেকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। প্রশাসনের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দ্রুততম সময়ে একটি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্ক্রিনিং প্যানেল’ গঠন করতে হবে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা এবং অভিযুক্তদের প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে দূরে রাখাই হবেই হবে আদর্শ দেশ করার জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বিদ্যমান আইনি কাঠামো নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের যেসব আইন রয়েছে, যেমন- সরকারি চাকরি আইন, সরকারি শৃঙ্খলা আপিল বিধি সেগুলো দুর্নীতি সহায়ক। এই আইন এবং বিধি থাকা অবস্থায় কখনো দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়।’ তবে নতুন সরকার দুর্নীতি সহায়ক এসব আইন ও বিধির সংস্কার করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

/বিবি/