শিরোনাম

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে নিয়োগ ও পদোন্নতির নামে ‘পুকুর চুরি’

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে নিয়োগ ও পদোন্নতির নামে ‘পুকুর চুরি’
মিঞা মোঃ নূরুল হক ও ছালেহ আহমাদ। কোলাজ: সিটিজেন জার্নাল

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অনিয়ম ও দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত এখানে আইন-কানুন আর স্বচ্ছতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনের পর নিয়োগ পাওয়া বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মোঃ নূরুল হক এবং রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ছালেহ আহমাদ। তাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

গোপন নিয়োগ থেকে শুরু করে ১৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, যোগ্যদের বঞ্চিত করে পছন্দের ব্যক্তিদের পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র অরক্ষিত রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘চেইন অফ কমান্ড’ ভেঙে পড়েছে এবং সবকিছুই চলছে নির্দিষ্ট কয়েকজনের খেয়াল-খুশিতে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের পাহাড়

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ নূরুল হক এবং রেজিস্ট্রার ছালেহ আহমাদ-এর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ১৮ জানুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এবং বোর্ডের ওয়েবসাইটে কোনো তথ্য প্রকাশ না করে গোপনীয়তার সঙ্গে ৩ জন ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ আড়াল করতে গত বছরের ১৪ নভেম্বর “দৈনিক নতুন আশা” নামক এক অখ্যাত পত্রিকায় নামমাত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, যা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া আর কেউ জানতো না।

এই নিয়োগ আড়াল করতে গত বছরের ১৪ নভেম্বর “দৈনিক নতুন আশা” নামক এক অখ্যাত পত্রিকায় নামমাত্র বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, যা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া আর কেউ জানতো না।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত মোঃ সাকিব আহমেদ স্বয়ং রেজিস্ট্রার ছালেহ আহমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। অপর নিয়োগপ্রাপ্ত মোঃ আকাব্বর মজুমদার বর্তমান চেয়ারম্যানের গাড়ি চালক ছিলেন।

পদোন্নতি ও বদলিতে ‘পছন্দ-অপছন্দ’ নীতি

বোর্ডের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও চলছে চরম বৈষম্য। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে কেবল পছন্দের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। রেজিস্ট্রারের ঘনিষ্ঠ সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ মিজানুর রহমানকে সুবিধা দিতে বিশেষ নিয়ম করে ১২ জন উচ্চমান সহকারীকে ভুতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই মোঃ আবুল কালাম, মোঃ আলতাব হোসেনসহ চারজন দক্ষ কর্মীকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের পিএ জুবায়ের আলম এবং ইয়াকুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের ঠিকই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাদ্রাশা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মোঃ নূরুল হককে একাধিকবার মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ছালেহ আহমাদ বলেন, আমরা বিধি মেনেই নিয়োগ দিয়েছি। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং আমাদের ওয়েবসাইডে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। কোন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশার আলো নামে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি।

আশার আলো নামে কোন পত্রিকা আছে কি না জানতে চাইলে ছালেহ আহমাদ বলেন, নাম ভুল হয়েছে, একটি জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক নতুন আশা’ নামের পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। বোর্ডের ওয়েবসাইটে কোন বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বরেন, সেই সময়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

আশার আলো নামে কোন পত্রিকা আছে কিনা জানতে চাইলে ছালেহ আহমাদ বলেন, নাম ভুল হয়েছে, একটি জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক নতুন আশা’ নামের পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। বোর্ডের ওয়েবসাইটে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই সময়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এদিকে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আরও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য চেয়ারম্যান নিজেই পরিদর্শনে যাচ্ছেন, নিজেই প্রতিবেদন দিচ্ছেন এবং সভাপতি হিসেবে নিজেই তা অনুমোদন করছেন। ফেনী, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫০ থেকে ১০০টি মাদ্রাসায় তিনি এভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিদর্শন কাজ সম্পন্ন করেছেন।

১৪ কোটি টাকার ছায়া ও অরক্ষিত রেকর্ড শাখা

বোর্ডের আইটি খাতের পরামর্শক মাহফুজ মুর্শেদের বিরুদ্ধে ফাজিল ও কামিল পরীক্ষার ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ খাতের প্রায় ১৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে অডিট আপত্তি ও নিয়োগে ব্যক্তিগত ফাইলে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও রেজিস্ট্রার ছালেহ আহমাদের সঙ্গে সখ্যতার কারণে তাকে বছরের পর বছর চুক্তিতে রাখা হচ্ছে।

বোর্ডের অত্যন্ত সংবেদনশীল সনদ শাখা (রেকর্ড শাখা) বর্তমানে অরক্ষিত। সেখানে নিয়মিত কর্মকর্তাদের বদলে দৈনিক মজুরিভিত্তিক বাইরের কর্মচারী দিয়ে মূল রেকর্ড বই নাড়াচাড়া ও সংশোধনের কাজ করানো হচ্ছে, যা সার্টিফিকেটের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো দুর্নীতির সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন চেয়ারম্যানের পিএ জুবায়ের আলম, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ মিজানুর রহমান, সেকশন অফিসার নাসির উদ্দিন মোল্লা এবং অফিস সহকারী আশিকুর রহমান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো দুর্নীতির সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন চেয়ারম্যানের পিএ জুবায়ের আলম, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ মিজানুর রহমান, সেকশন অফিসার নাসির উদ্দিন মোল্লা এবং অফিস সহকারী আশিকুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, জুবায়ের আলমের কথাই বোর্ডের শেষ কথা এবং তার সিদ্ধান্তেই চেয়ারম্যান ও রেজিস্ট্রার চলেন।

বোর্ডের আইন-২০২০ এবং প্রবিধানমালা-২০০৬ উপেক্ষা করে নিজেদের পছন্দের কমিটি গঠনের মাধ্যমে পুরো প্রতিষ্ঠানকে লুটেপুটে খাওয়ার এই উৎসবে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশেও যদি এমন জঘন্য অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি অব্যাহত থাকে, তবে সংস্কারের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে। তাই অবিলম্বে অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে জানান তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আমূল পরিবর্তন করা হয়। পুরনো সব কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে নিয়োগ পান নতুন চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মোঃ নুরুল হক, রেজিস্ট্রার প্রফেসর ছালেহ আহমাদসহ আরো অনেকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আমূল পরিবর্তন করা হয়। পুরোনো সব কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে নিয়োগ পান নতুন চেয়ারম্যান মিঞা মোঃ নুরুল হক, রেজিস্ট্রার ছালেহ আহমাদসহ আরো অনেকে। জামায়াতপন্থী এই চেয়ারম্যান নিয়োগ পেয়েই প্রতি পদে পদে দুর্নীতির ছাপ রেখেছেন।

দুর্নীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণী অথবা যে শ্রেণীরই নিয়োগ হোক না কেন নিয়ম হচ্ছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি বাংলা জাতীয় দৈনিক এবং একটি ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়। তারা যে পত্রিকায় দিয়েছে তার নাম কখনো শুনিনি। কোন প্রমাণও দেখিনি। এ ছাড়া যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা চেয়ারম্যান ও রেজিষ্ট্রারের নিকটাত্মীয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নিয়ম হচ্ছে চেয়ারম্যানের নির্দেশে তার নিচের পদের কর্মকর্তারা মাদ্রাসা পরিদর্শন করে রিপোর্ট দিবে। চেয়ারম্যান সেই রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করে অনুমোদন দিবে। কিন্তু তিনি বিভিন্ন জায়গায় মাদ্রাসা পরিদর্শনে গেছেন। তিনি নিজেই রিপোর্ট দিয়েছেন। আবার নিজেই সেসব রিপোর্ট অনুমোদন করেছেন।

/টিই/