শিরোনাম

পাটের চটে চোখজুড়ানো দৃশ্য, তানিয়ার পণ্য যাচ্ছে বিদেশে

মোহাম্মদ শাহীনুর রহমান, পাবনা
মোহাম্মদ শাহীনুর রহমান, পাবনা
পাটের চটে চোখজুড়ানো দৃশ্য, তানিয়ার পণ্য যাচ্ছে বিদেশে
নারীদের কাজ বুঝিয়ে দেন উদ্যোক্তা তানিয়া আফরোজ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

প্রায় ৪২ বছর আগের কথা। ওই সময় নারীরা দলবেঁধে কাঁথা সেলাই করতেন। সেখান থেকেই তানিয়া আফরোজের সেলাইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্কুলে একদিন মেয়েদের কাঁথা সেলাই প্রতিযোগিতা হয়। সেই প্রতিযোগিতায় হেরে যান তিনি। এরপর সেলাই শেখার জেদ চাপে তার।

সুই-সুতার ফোঁড়ে পাটের চটে ফুটে উঠছে ফুল-পাখি, লতা-পাতা ও গ্রামবাংলার চিত্র। পাশাপাশি কাপড়ে আঁকা হচ্ছে রঙিন ছবি। যা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কুশন কভার, গ্লাস ম্যাট সহ নানা পণ্য। অনলাইনে এসব পণ বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশে। শৈল্পিক এই কাজের মাধ্যমে সারাদেশে নজর কেড়েছেন পাবনা জেলা শহরের মন্ডলপাড়া মহল্লার উদ্যোক্তা তানিয়া আফরোজ।

আলাপকালে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘পাটের চটে ছবি আঁকার পর সেখানে সুই-সুতার মাধ্যমে নিপুণ বুননের কাজ করা হয়। আমি এই কাজ গ্রামের নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি। তারা সংসারের কাজের পাশাপাশি শৈল্পিক কাজ করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন।’

নারী উদ্যোক্তা তানিয়া আফরোজ।
নারী উদ্যোক্তা তানিয়া আফরোজ।

তানিয়ার কাছ থেকে কাজ শিখে উপার্জন করছেন পাবনা পৌর সদরের মন্ডলপাড়া এলাকার সুমাইয়া খাতুন, সিমা খাতুন, সাধুপাড়া মহল্লার কানিজ ফাতেমা ও ঈশ্বরদী উপজেলার বাঁশেরবাদা গ্রামের কাকলী খাতুন।

পৌর সদরের সাধুপাড়া মহল্লার কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘৫ বছর ধরে তানিয়া আপার সঙ্গে কাজ করছি। তিনি কাজ শিখিয়েছেন। এখন আমি মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারি। আমাদের মতো গৃহিণীদের এই উপার্জনে সংসারে অনেক উপকার হয়।’

তানিয়ার ভাষায়, ‘স্কুল জীবনে মা আমাকে সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা করেন। এক পর্যায়ে কাজটি আমার আয়ত্ত চলে আসে। এর মধ্যে আমি স্নাতক পাশ করি। বিয়েও করি। এরপর সংসার জীবনে দুই কন্যা সন্তানের মা হই।’

পাটের চটে সুই-সুতার নিপুণ বুননে ফুটে উঠছে বৃষ্টি বিলাসের দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম
পাটের চটে সুই-সুতার নিপুণ বুননে ফুটে উঠছে বৃষ্টি বিলাসের দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

জানা গেছে, তানিয়া আফরোজ কিছুদিন একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া একটি বেসরকারি কোম্পানিতেও কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি দুই সন্তানকে বড় করেছেন। এতকিছুর মধ্যেও রঙিন সুতায় ছবি আঁকা ছাড়েননি। করোনাকালীন চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসেন। তখন সময় কাটছিল না, চিন্তা আসে শখের কাজটিকে ব্যবসায় রূপ দিবেন। সেই চিন্তা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন।

তানিয়া বলেন, ‘আমি ২০১৮ সালে সুই-সুতা দিয়ে একটি ছবি আঁকি, একজন সেটি ১০ হাজার টাকায় কিনে নেন। এই টাকাই আমার ব্যবসায়ের প্রথম পুঁজি। তা দিয়ে সুতা ও চট কিনে কাজ শুরু করি। ছবি তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট দেই। মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যায়। একদিন আমেরিকা থেকে ৫০টি ছবির অর্ডার আসে। এতে আমি উৎসাহিত হই। এখন প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকার ছবি বিক্রি করি।’

সুই-সুতার ফোঁড়ে ফুটে উঠেছে মনমাতানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম
পাটের চটে সুই-সুতার নিপুণ বুননে ফুটে উঠছে বৃষ্টি বিলাসের দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

তানিয়ার ভাষ্য, বেশ কয়েকজন নারী কর্মী কাজ করছেন। ছবির ধরন ও সংখ্যা অনুযায়ী টাকা পান তারা। তাদের ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত হাজিরা দেওয়া হয়।

ঈশ্বরদী উপজেলার বাঁশেরবাদা গ্রামের কাকলী খাতুন বলেন, ‘আপার কাজ দেখে খুব ভালো লাগে। কাজ শেখার ইচ্ছা পোষণ করলে তিনি হাতে-কলমে কাজ শেখান। প্রতিটি কাজে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাই।’

তানিয়া জানান, ছবি তৈরির মূল উপকরণ পাটের চট, কাপড় ও রঙিন সুতা। ঢাকা থেকে তিনি এসব উপকরণ সংগ্রহ করেন। প্রতিটি ছবি তৈরিতে করতে তিন থেকে সাতদিন সময় লাগে। বড় ছবি হলে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। ২০২০ সালে তিনি ধানমন্ডির গ্যালারি-২৭ এ নিজের তৈরি ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেন। এতে ছবির প্রচার যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়তে থাকে চাহিদাও। সুইয়ের ফোঁড়ে ছবি তৈরি অনেক ধৈর্য্যের কাজ। অনেক সময় লাগে। একটি ফোঁড় ভুল হলে পুরো ছবি নষ্ট হয়। তাই এটাকে শুধু পণ্য হিসাবে ভাবলে চলবে না। শিল্পকর্ম হিসেবে দেখতে হবে।

তানিয়া আফরোজের মেয়ে ফারিহা জামান বলেন, ‘মায়ের প্রতিটি কাজ পরিবারের সবাইকে মুগ্ধ করে। মা এক সময় আমাদের ভুলে সেলাইয়ে মেতে থাকতেন। তখন বাবা রাগ করতেন। পরবর্তীতে কাজ দেখে বাবা মুগ্ধও হয়েছেন।’

/এসআর/