শিরোনাম

ট্রাইব্যুনালে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ট্রাইব্যুনালে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ
ট্রাইব্যুনালে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ। কোলাজ: সিটিজেন গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হচ্ছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সংস্থাটি বলছে, তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিচারকরা তদন্ত কর্মকর্তাদের নথিভুক্ত করা এমন সাক্ষ্য বিবৃতির ওপর নির্ভর করছেন, যেগুলোর একাধিক বিবৃতিতে একই অনুচ্ছেদ পাওয়া গেছে। এতে এসব সাক্ষ্য বিবৃতির সত্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক ডজনেরও বেশি মামলার পর্যবেক্ষণে যথাযথ প্রক্রিয়ার (ডিউ প্রসেস) বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, প্রসিকিউটররা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই ব্যক্তিদের আটক ও অভিযুক্ত করেছেন। এছাড়া একাধিক মামলায় সাক্ষ্যবিবৃতিতে একই ধরনের দোষারোপমূলক অংশ বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে যুক্ত করা হয়েছে বলে দেখা গেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরিচালনায় কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ব্যর্থতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

এতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

ট্রাইব্যুনালে সুষ্ঠু বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ 1
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত বহু নির্যাতনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে অনেক বিচারই আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না। বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে তার ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে এবং নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সুযোগ না থাকে।

আরও বলা হয়, ট্রাইব্যুনাল মূলত ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর বিচার করছে। ওই অভিযানে ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের ফলেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

এছাড়া শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো অন্যান্য অভিযোগও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ৬টি মামলার বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার তাদের অনুপস্থিতিতে হয়েছে, যার মধ্যে শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এছাড়া ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, প্রসিকিউটররা তাদের গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানাননি। এটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের পরিপন্থি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রসিকিউটররা কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন। আটক ব্যক্তিদের মাসের পর মাস লিখিত কারণ ছাড়াই আটক রাখা যায়। পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের অধিকার নেই।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রসিকিউশন তাদের পাওয়া প্রমাণগুলো প্রকাশের মাত্র তিন সপ্তাহ পরই বিচার শুরু করা সম্ভব, যা আসামিপক্ষের প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত অল্প সময়। অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারগুলোতেও অভিযুক্তদের নিজেদের আইনজীবী নির্বাচন করার অধিকারসহ যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় না। এছাড়া প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষমতাও সীমিত।

২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের এক সমাবেশ নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের কারণে গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সেসময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল।

কিন্তু প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং উপস্থাপক ফারজানা রূপা সরকারকে হত্যাকাণ্ড গোপন করতে সহায়তা করেছিলেন এবং ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচার করেছিলেন।

সাংবাদিকদের আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, প্রসিকিউটররা তাদের গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানাননি। এটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের পরিপন্থি।

২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিকসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়। আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলতে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট অপরাধকে বোঝায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, একই মামলায় আটক থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে এমন একটি অডিও রেকর্ডিং দেন, যাতে দাবি করা হয় যে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার জামিন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিচারকরা এমন সাক্ষ্য বিবৃতির ওপর নির্ভর করছেন, যেখানে তদন্ত কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা একাধিক বিবৃতিতে একই অনুচ্ছেদ হুবহু বা প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এতে এসব সাক্ষ্য বিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এর একটি উদাহরণ হলো ডা. মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যান্য মামলাটি। এই মামলায় চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২২ জন রাজনীতিবিদ ও কর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে প্রকাশিত ৫৫টি সাক্ষ্য বিবৃতি রয়েছে।

‘এসব বিবৃতির মধ্যে একটি ছয় লাইনের অনুচ্ছেদ, যা ১৪টি পৃথক সাক্ষ্য বিবৃতিতে প্রায় শব্দে শব্দে একই রকম পাওয়া গেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সাতজন রাজনীতিবিদ পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ছয়জনকে হত্যা করেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, একই মামলায় আটক থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে এমন একটি অডিও রেকর্ডিং দেন, যাতে দাবি করা হয় যে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার জামিন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

রেকর্ডিং প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন। তবে প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয় এখনো তদন্ত শেষ করেনি। এদিকে বিচারকরা অভিযোগ গঠন সম্পন্ন করেছেন এবং মামলার বিচার ৬ আগস্ট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলীকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের উপলব্ধি করা উচিত যে তারা অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বিচার পুনরাবৃত্তি করতে পারে না। একই ধরনের সাক্ষ্যবিবৃতির ওপর ভিত্তি করে আনা অভিযোগ একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবকে স্পষ্ট করে। এর ফলে আবারও ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রসঙ্গত, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশে ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। তখন বিচারের পর ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ৫ জন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং একজন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, সেই বিচারগুলো প্রমাণের দুর্বলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে আঁতাত এবং মৌলিক ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার অভাবের কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।

সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠন করে একই ট্রাইব্যুনাল।

পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় দেওয়া হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপরাধের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে।

তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংশোধনগুলো আন্তর্জাতিক আদালতের সমমানের ন্যায্য বিচার ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট ছিল না।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এ বিষয়ে আর কোনো সংশোধন আনা হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং এমনকী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

/এফসি/