চেয়ারম্যানের অনিয়মে ডুবছে আইএফআইসি ব্যাংক

চেয়ারম্যানের অনিয়মে ডুবছে আইএফআইসি ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে। ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরতে পরতে চলছে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের মহোৎসব। প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, অহেতুক পর্ষদ সভা ডেকে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অপ্রয়োজনে বিদেশ সফর ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক । ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন ওই পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করা বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত দলের সদস্যরা ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও নিয়ন্ত্রমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার নম্বর-২ এর ১০.২(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক কোনোভাবেই ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে কিংবা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে দেখা যায়, বিতর্কিত কয়েকটি ঋণের অনিয়ম তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আটটি বৈঠকে অংশ নিয়ে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী নিয়েছেন।
এছাড়া ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজি মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তারা ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিনই ব্যাংকের গুলশান শাখা, প্রিন্সিপাল শাখা ও নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শাখার শীর্ষ করপোরেট গ্রাহকদের (যেমন মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ, মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ) সঙ্গে ব্যাংকেই সরাসরি বৈঠক করেছেন। এটি বিআরপিডির সার্কুলারের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ।
ছবি ও বাণী প্রচারের ফাঁদে অপচয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিকেশন বিভাগকে ব্যবহার করে সকল শাখা ও উপশাখায় নিজ বাণী ও ছবি টাঙানোর তাগিদ দেন বর্তমান চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যানের এমন আত্মপ্রচারে গ্রাহক ও কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সভার নামে মোটা অঙ্কের টাকা তছরুপ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভা করে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী নিয়েছেন। এছাড়া অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নির্বাহী কমিটির নামে প্রতি মাসে অসংখ্য অতিরিক্ত বৈঠক দেখিয়ে ব্যাংকের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনহীন বিদেশ ভ্রমণ ও অতিরিক্ত ব্যয়
ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক স্বার্থ বা উদ্দেশ্যের কোনো যোগসূত্র না থাকার পরও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অপচয়কৃত এই বিপুল অর্থ এখনো ব্যাংকের তহবিলে ফেরত জমা দেওয়া হয়নি। ইউকে সাবসিডিয়ারি (আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার লিমিটেড, ইউকে) পরিচালনার নামেও ভুয়া পর্ষদ সভা ও অহেতুক বিমানের টিকিট, ভাতা ও হোটেল খরচ দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে বোর্ড সভা ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে ব্যাংকের ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও স্বজনপ্রীতি
ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়োগে অনিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে ঋণ পুনরুদ্ধার বিভাগের প্রধান হিসেবে (হেড অব রিকভারি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি নথিতে পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনকে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেহমুদ হোসেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি এক্সিম ব্যাংক পিএলসি ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া বা অনিয়মে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে আইএফআইসি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনের নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ
আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন ও আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে।
দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ
ব্যাংকের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য কোনো অবস্থাতেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও শাখা ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
প্রচার সামগ্রী অপসারণ
শাখা ও উপশাখাগুলোতে টানানো চেয়ারম্যানের ছবিসহ অন্য প্রচার সামগ্রী অনতিবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।
অযাচিত সম্মানী ফেরত আনা
অনিয়মিত ও অহেতুক তদন্ত কমিটি এবং প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া বাড়তি পর্ষদ সম্মানী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তহবিলে অতিদ্রুত ফেরত জমা দিতে হবে।
নিয়োগ বিতর্ক পুনর্বিবেচনা
নিয়মবহির্ভূত ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এরবং ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর ব্যাংকটির দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার বিদেশিদের হাতে। দুই বছর ধরে ব্যাংকটি লোকসানে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
লোকসানে থাকা ব্যাংকটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন ও নিরপেক্ষতা। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অনিয়ম দ্রুত নিরসন না করা হলে গ্রাহকদের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। এই বাংলাদেশ ব্যাংককে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা।

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে। ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরতে পরতে চলছে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের মহোৎসব। প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, অহেতুক পর্ষদ সভা ডেকে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অপ্রয়োজনে বিদেশ সফর ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক । ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন ওই পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করা বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত দলের সদস্যরা ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও নিয়ন্ত্রমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার নম্বর-২ এর ১০.২(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক কোনোভাবেই ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে কিংবা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে দেখা যায়, বিতর্কিত কয়েকটি ঋণের অনিয়ম তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আটটি বৈঠকে অংশ নিয়ে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী নিয়েছেন।
এছাড়া ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজি মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তারা ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিনই ব্যাংকের গুলশান শাখা, প্রিন্সিপাল শাখা ও নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শাখার শীর্ষ করপোরেট গ্রাহকদের (যেমন মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ, মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ) সঙ্গে ব্যাংকেই সরাসরি বৈঠক করেছেন। এটি বিআরপিডির সার্কুলারের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ।
ছবি ও বাণী প্রচারের ফাঁদে অপচয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিকেশন বিভাগকে ব্যবহার করে সকল শাখা ও উপশাখায় নিজ বাণী ও ছবি টাঙানোর তাগিদ দেন বর্তমান চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যানের এমন আত্মপ্রচারে গ্রাহক ও কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সভার নামে মোটা অঙ্কের টাকা তছরুপ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভা করে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী নিয়েছেন। এছাড়া অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নির্বাহী কমিটির নামে প্রতি মাসে অসংখ্য অতিরিক্ত বৈঠক দেখিয়ে ব্যাংকের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনহীন বিদেশ ভ্রমণ ও অতিরিক্ত ব্যয়
ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক স্বার্থ বা উদ্দেশ্যের কোনো যোগসূত্র না থাকার পরও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অপচয়কৃত এই বিপুল অর্থ এখনো ব্যাংকের তহবিলে ফেরত জমা দেওয়া হয়নি। ইউকে সাবসিডিয়ারি (আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার লিমিটেড, ইউকে) পরিচালনার নামেও ভুয়া পর্ষদ সভা ও অহেতুক বিমানের টিকিট, ভাতা ও হোটেল খরচ দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে বোর্ড সভা ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে ব্যাংকের ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও স্বজনপ্রীতি
ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়োগে অনিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে ঋণ পুনরুদ্ধার বিভাগের প্রধান হিসেবে (হেড অব রিকভারি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি নথিতে পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনকে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেহমুদ হোসেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি এক্সিম ব্যাংক পিএলসি ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া বা অনিয়মে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে আইএফআইসি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনের নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ
আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন ও আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে।
দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ
ব্যাংকের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য কোনো অবস্থাতেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও শাখা ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
প্রচার সামগ্রী অপসারণ
শাখা ও উপশাখাগুলোতে টানানো চেয়ারম্যানের ছবিসহ অন্য প্রচার সামগ্রী অনতিবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।
অযাচিত সম্মানী ফেরত আনা
অনিয়মিত ও অহেতুক তদন্ত কমিটি এবং প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া বাড়তি পর্ষদ সম্মানী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তহবিলে অতিদ্রুত ফেরত জমা দিতে হবে।
নিয়োগ বিতর্ক পুনর্বিবেচনা
নিয়মবহির্ভূত ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এরবং ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর ব্যাংকটির দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার বিদেশিদের হাতে। দুই বছর ধরে ব্যাংকটি লোকসানে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
লোকসানে থাকা ব্যাংকটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন ও নিরপেক্ষতা। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অনিয়ম দ্রুত নিরসন না করা হলে গ্রাহকদের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। এই বাংলাদেশ ব্যাংককে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা।

চেয়ারম্যানের অনিয়মে ডুবছে আইএফআইসি ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে। ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরতে পরতে চলছে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের মহোৎসব। প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, অহেতুক পর্ষদ সভা ডেকে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়া, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অপ্রয়োজনে বিদেশ সফর ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের একটি নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক । ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন ওই পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করা বা দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত দলের সদস্যরা ব্যাংকটিতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও নিয়ন্ত্রমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার নম্বর-২ এর ১০.২(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বা কোনো পরিচালক কোনোভাবেই ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে কিংবা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে দেখা যায়, বিতর্কিত কয়েকটি ঋণের অনিয়ম তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি আটটি বৈঠকে অংশ নিয়ে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী নিয়েছেন।
এছাড়া ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজি মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তারা ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিনই ব্যাংকের গুলশান শাখা, প্রিন্সিপাল শাখা ও নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শাখার শীর্ষ করপোরেট গ্রাহকদের (যেমন মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ, মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ) সঙ্গে ব্যাংকেই সরাসরি বৈঠক করেছেন। এটি বিআরপিডির সার্কুলারের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ।
ছবি ও বাণী প্রচারের ফাঁদে অপচয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিকেশন বিভাগকে ব্যবহার করে সকল শাখা ও উপশাখায় নিজ বাণী ও ছবি টাঙানোর তাগিদ দেন বর্তমান চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যানের এমন আত্মপ্রচারে গ্রাহক ও কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সভার নামে মোটা অঙ্কের টাকা তছরুপ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভা করে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী নিয়েছেন। এছাড়া অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নির্বাহী কমিটির নামে প্রতি মাসে অসংখ্য অতিরিক্ত বৈঠক দেখিয়ে ব্যাংকের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদনহীন বিদেশ ভ্রমণ ও অতিরিক্ত ব্যয়
ব্যাংকের মূল ব্যবসায়িক স্বার্থ বা উদ্দেশ্যের কোনো যোগসূত্র না থাকার পরও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অপচয়কৃত এই বিপুল অর্থ এখনো ব্যাংকের তহবিলে ফেরত জমা দেওয়া হয়নি। ইউকে সাবসিডিয়ারি (আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার লিমিটেড, ইউকে) পরিচালনার নামেও ভুয়া পর্ষদ সভা ও অহেতুক বিমানের টিকিট, ভাতা ও হোটেল খরচ দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে বোর্ড সভা ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে ব্যাংকের ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও স্বজনপ্রীতি
ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়োগে অনিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে ঋণ পুনরুদ্ধার বিভাগের প্রধান হিসেবে (হেড অব রিকভারি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি নথিতে পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনকে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেহমুদ হোসেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি এক্সিম ব্যাংক পিএলসি ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া বা অনিয়মে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে আইএফআইসি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনের নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ
আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন ও আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশকিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে।
দৈনন্দিন কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ
ব্যাংকের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য কোনো অবস্থাতেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও শাখা ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
প্রচার সামগ্রী অপসারণ
শাখা ও উপশাখাগুলোতে টানানো চেয়ারম্যানের ছবিসহ অন্য প্রচার সামগ্রী অনতিবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে হবে।
অযাচিত সম্মানী ফেরত আনা
অনিয়মিত ও অহেতুক তদন্ত কমিটি এবং প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া বাড়তি পর্ষদ সম্মানী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় তহবিলে অতিদ্রুত ফেরত জমা দিতে হবে।
নিয়োগ বিতর্ক পুনর্বিবেচনা
নিয়মবহির্ভূত ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত ৩০ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এরবং ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর ব্যাংকটির দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার বিদেশিদের হাতে। দুই বছর ধরে ব্যাংকটি লোকসানে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
লোকসানে থাকা ব্যাংকটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন ও নিরপেক্ষতা। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অনিয়ম দ্রুত নিরসন না করা হলে গ্রাহকদের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে যাবে। এই বাংলাদেশ ব্যাংককে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা।








