প্রবীণ শিক্ষককে ৭ মামলার ঘা

প্রবীণ শিক্ষককে ৭ মামলার ঘা
হাসিবুল ফারুক চৌধুরী

ফেনীর ফাজিলপুর জিন্নাহ্ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক নিজের ভিটা ছেড়ে এখন উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। প্রবীণ এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একে এক দেওয়া হয়েছে ৭টি মামলা। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
আজিজুল হকের বয়স প্রায় ৮০ বছর। তার ৫ মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। ফাজিলপুর জিন্নাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে বহু কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে বাড়ির পাশেই কিনেছিলেন ৯ শতাংশ জমি। সেখানে টিনের ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছিলেন। প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত ওই জমির ওপর নজর পড়ে তারই এক নিকটাত্মীয়ের।
কয়েক বছর আগে জমিটি মেয়েদের নামে লিখে দেন আজিজুল হক। এর পর থেকেই তার ওপর আসতে থাকে নানা ধরনের হুমকি। তাকে বিতর্কিত করার জন্য আওয়ামী লীগের আমলে নানা তকমা দেওয়া হয়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ‘আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ’ আখ্যা দিয়ে বাড়ি-ঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন আজিজুল হকের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন)।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিনদিনের মাথায় ওই বাড়িতে চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। ৮ আগস্ট সকালে জ্যাকসনের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন বহিরাগত বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেয়। প্রথমে তারা বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ টিনের ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। এদিকে জ্যাকসন ও তার ভাই নাজমুলসহ কয়েকজন আজিজুল হকের বাসভবনে ঢুকে পড়েন। সেখানে ছিলেন তার স্ত্রী শাহিন আরা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মাহমুদা আকতার ও জামাতা মামুন। তাদের বেঁধে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মামুনের মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। দুপুর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব।

হামলার দিন আজিজুল হক বাড়িতে ছিলেন না, চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে আসেন। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্যাতিতদের উদ্ধার করা হয়। সেদিন এক কাপড়ে সবাইকে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয়।
পরদিন সকালে আমিনবাজার সেনা ক্যাম্পে ডাকা হয় দুই পক্ষকে। ক্যাম্পে সবার বক্তব্য শুনে জ্যাকসন ও তার পরিবারকে ভর্ৎসনা করা হয়। আর নির্যাতিত পরিবারকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে একটি দরখাস্ত দিতে বলা হয়।
৭ মামলার ঘা
আজিজুল হকের জমিটি দখলে নিতে এ পর্যন্ত ৭টি মামলা করেছে জ্যাকসন ও তার পরিবার। ২০১৩ সালে প্রথম ফৌজদারি আইনে মামলা করেন জ্যাকসনের বাবা মর্তুজা ভূঁঞা। একই আইনে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মামলা করেন জ্যাকসন। দুটি মামলার রায়ই তাদের বিপক্ষে যায়। এরপর ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রিভিশন মামলা করা হয়। গত ৫ মার্চ আদালতের রায়ে সেটিও ‘নামঞ্জুর’ হয়।

জ্যাকসন, তার মা ও দুই ভাই গত ১০ মার্চ আজিজুল হক ও তার ৫ কন্যার বিরুদ্ধে ফেনী সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ‘স্বত্ব ঘোষণা’র দাবি জানিয়ে মামলা করেন। মামলাটি এখনও চলছে। পরদিন ১১ মার্চ ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পঞ্চম মামলাটি হয়। ফৌজদারি আইনে এ মামলা করেন জ্যাকসনের মা নিলুফা আক্তার। তবে একই আইনে আগের দুটি মামলার মতো এটিও প্রত্যাহার হয়।
আবার ১৩ এপ্রিল আজিজুল হকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন নিলুফা আক্তার। সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল ফৌজদারি আইনে আরেকটি মামলা করেন জ্যাকসনের ভাই নাজমুল হোসেন। সেটি এখনো চলমান রয়েছে।
আজিজুল হকের মামলা
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আজিজুল হক ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর ১৪ আগস্ট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠক হয়। সেদিন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপার পর উভয় পক্ষকে নিজ নিজ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সালিশনামা মেনে নিয়ে জ্যাকসন তাতে স্বাক্ষরও করেন।
তবে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আজিজুল হক তার সীমানা প্রাচীর মেরামত করতে গেলে জ্যাকসনের লোকজন আবার বাধা দেয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, সেটিও আজিজুল হকের পক্ষে গেছে।
হামলা ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে আজিজুল হক ও তার বড় মেয়ে মরিয়ম আকতারের করা দুটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে।
৮ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন) সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেদিন তাদের লোকজন আমাদের উপরে হামলা করেছে। আমাদের পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। আমার আম্মা আহত হন। আমি এবং আমার ভাই আহত হই। ওইটা নিয়ে মামলা হয়েছে।
সালিশনামায় সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির চৌহদ্দি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। দলিলে যে চৌহদ্দি উল্লেখ আছে সেই অনুসারে তারা মানতে রাজি নন। পরে বনিবনা হয়নি দেখে কোর্টে মামলা করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনীর বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, আজিজুল হকের জমি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। এর তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

হামলার পর অজিজুল হক ওই বাড়িতে আর ফিরে যেতে পারেননি। আজ এক মেয়ের ঘরে, কাল আরেকজনের ঘরে তিনি দিন পার করছেন।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজের বাড়িতে উঠতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জানাতে পারে। জেলা প্রশাসক ভূমি আইনে তাদের বাড়িতে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য তারা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে আবেদন জানাতে পারেন।
আজিজুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের আগেও আমাকে হয়রানি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে ‘আওয়ামী লীগ’ বানিয়েছে। আসলে আমি তো কোনো দলীয় রাজনীতি করি না। আমি সামান্য মানুষ, ইসলামের পথে চলি।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তৎকালীন ফেনী মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জয়নাল হাজারী আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। ওই সার্টিফিকেটই আমার জন্য যথেষ্ট। এটা দিয়ে আমি কোনো সুবিধা নেওয়ার চিন্তা করিনি।
প্রবীণ এই শিক্ষকের দাবি, জীবনের শেষ সময়টা তিনি নিজের জায়গায় নিরাপদে বসবাস করতে চান। প্রশাসন যেন তাকে সেই ব্যবস্থা করে দেয়।

ফেনীর ফাজিলপুর জিন্নাহ্ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক নিজের ভিটা ছেড়ে এখন উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। প্রবীণ এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একে এক দেওয়া হয়েছে ৭টি মামলা। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
আজিজুল হকের বয়স প্রায় ৮০ বছর। তার ৫ মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। ফাজিলপুর জিন্নাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে বহু কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে বাড়ির পাশেই কিনেছিলেন ৯ শতাংশ জমি। সেখানে টিনের ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছিলেন। প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত ওই জমির ওপর নজর পড়ে তারই এক নিকটাত্মীয়ের।
কয়েক বছর আগে জমিটি মেয়েদের নামে লিখে দেন আজিজুল হক। এর পর থেকেই তার ওপর আসতে থাকে নানা ধরনের হুমকি। তাকে বিতর্কিত করার জন্য আওয়ামী লীগের আমলে নানা তকমা দেওয়া হয়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ‘আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ’ আখ্যা দিয়ে বাড়ি-ঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন আজিজুল হকের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন)।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিনদিনের মাথায় ওই বাড়িতে চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। ৮ আগস্ট সকালে জ্যাকসনের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন বহিরাগত বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেয়। প্রথমে তারা বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ টিনের ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। এদিকে জ্যাকসন ও তার ভাই নাজমুলসহ কয়েকজন আজিজুল হকের বাসভবনে ঢুকে পড়েন। সেখানে ছিলেন তার স্ত্রী শাহিন আরা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মাহমুদা আকতার ও জামাতা মামুন। তাদের বেঁধে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মামুনের মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। দুপুর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব।

হামলার দিন আজিজুল হক বাড়িতে ছিলেন না, চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে আসেন। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্যাতিতদের উদ্ধার করা হয়। সেদিন এক কাপড়ে সবাইকে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয়।
পরদিন সকালে আমিনবাজার সেনা ক্যাম্পে ডাকা হয় দুই পক্ষকে। ক্যাম্পে সবার বক্তব্য শুনে জ্যাকসন ও তার পরিবারকে ভর্ৎসনা করা হয়। আর নির্যাতিত পরিবারকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে একটি দরখাস্ত দিতে বলা হয়।
৭ মামলার ঘা
আজিজুল হকের জমিটি দখলে নিতে এ পর্যন্ত ৭টি মামলা করেছে জ্যাকসন ও তার পরিবার। ২০১৩ সালে প্রথম ফৌজদারি আইনে মামলা করেন জ্যাকসনের বাবা মর্তুজা ভূঁঞা। একই আইনে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মামলা করেন জ্যাকসন। দুটি মামলার রায়ই তাদের বিপক্ষে যায়। এরপর ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রিভিশন মামলা করা হয়। গত ৫ মার্চ আদালতের রায়ে সেটিও ‘নামঞ্জুর’ হয়।

জ্যাকসন, তার মা ও দুই ভাই গত ১০ মার্চ আজিজুল হক ও তার ৫ কন্যার বিরুদ্ধে ফেনী সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ‘স্বত্ব ঘোষণা’র দাবি জানিয়ে মামলা করেন। মামলাটি এখনও চলছে। পরদিন ১১ মার্চ ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পঞ্চম মামলাটি হয়। ফৌজদারি আইনে এ মামলা করেন জ্যাকসনের মা নিলুফা আক্তার। তবে একই আইনে আগের দুটি মামলার মতো এটিও প্রত্যাহার হয়।
আবার ১৩ এপ্রিল আজিজুল হকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন নিলুফা আক্তার। সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল ফৌজদারি আইনে আরেকটি মামলা করেন জ্যাকসনের ভাই নাজমুল হোসেন। সেটি এখনো চলমান রয়েছে।
আজিজুল হকের মামলা
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আজিজুল হক ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর ১৪ আগস্ট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠক হয়। সেদিন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপার পর উভয় পক্ষকে নিজ নিজ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সালিশনামা মেনে নিয়ে জ্যাকসন তাতে স্বাক্ষরও করেন।
তবে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আজিজুল হক তার সীমানা প্রাচীর মেরামত করতে গেলে জ্যাকসনের লোকজন আবার বাধা দেয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, সেটিও আজিজুল হকের পক্ষে গেছে।
হামলা ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে আজিজুল হক ও তার বড় মেয়ে মরিয়ম আকতারের করা দুটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে।
৮ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন) সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেদিন তাদের লোকজন আমাদের উপরে হামলা করেছে। আমাদের পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। আমার আম্মা আহত হন। আমি এবং আমার ভাই আহত হই। ওইটা নিয়ে মামলা হয়েছে।
সালিশনামায় সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির চৌহদ্দি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। দলিলে যে চৌহদ্দি উল্লেখ আছে সেই অনুসারে তারা মানতে রাজি নন। পরে বনিবনা হয়নি দেখে কোর্টে মামলা করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনীর বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, আজিজুল হকের জমি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। এর তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

হামলার পর অজিজুল হক ওই বাড়িতে আর ফিরে যেতে পারেননি। আজ এক মেয়ের ঘরে, কাল আরেকজনের ঘরে তিনি দিন পার করছেন।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজের বাড়িতে উঠতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জানাতে পারে। জেলা প্রশাসক ভূমি আইনে তাদের বাড়িতে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য তারা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে আবেদন জানাতে পারেন।
আজিজুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের আগেও আমাকে হয়রানি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে ‘আওয়ামী লীগ’ বানিয়েছে। আসলে আমি তো কোনো দলীয় রাজনীতি করি না। আমি সামান্য মানুষ, ইসলামের পথে চলি।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তৎকালীন ফেনী মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জয়নাল হাজারী আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। ওই সার্টিফিকেটই আমার জন্য যথেষ্ট। এটা দিয়ে আমি কোনো সুবিধা নেওয়ার চিন্তা করিনি।
প্রবীণ এই শিক্ষকের দাবি, জীবনের শেষ সময়টা তিনি নিজের জায়গায় নিরাপদে বসবাস করতে চান। প্রশাসন যেন তাকে সেই ব্যবস্থা করে দেয়।

প্রবীণ শিক্ষককে ৭ মামলার ঘা
হাসিবুল ফারুক চৌধুরী

ফেনীর ফাজিলপুর জিন্নাহ্ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক নিজের ভিটা ছেড়ে এখন উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। প্রবীণ এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একে এক দেওয়া হয়েছে ৭টি মামলা। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
আজিজুল হকের বয়স প্রায় ৮০ বছর। তার ৫ মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। ফাজিলপুর জিন্নাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে বহু কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। তিল তিল করে জমানো টাকা দিয়ে বাড়ির পাশেই কিনেছিলেন ৯ শতাংশ জমি। সেখানে টিনের ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছিলেন। প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত ওই জমির ওপর নজর পড়ে তারই এক নিকটাত্মীয়ের।
কয়েক বছর আগে জমিটি মেয়েদের নামে লিখে দেন আজিজুল হক। এর পর থেকেই তার ওপর আসতে থাকে নানা ধরনের হুমকি। তাকে বিতর্কিত করার জন্য আওয়ামী লীগের আমলে নানা তকমা দেওয়া হয়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ‘আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ’ আখ্যা দিয়ে বাড়ি-ঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন আজিজুল হকের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন)।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিনদিনের মাথায় ওই বাড়িতে চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। ৮ আগস্ট সকালে জ্যাকসনের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন বহিরাগত বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেয়। প্রথমে তারা বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ টিনের ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। এদিকে জ্যাকসন ও তার ভাই নাজমুলসহ কয়েকজন আজিজুল হকের বাসভবনে ঢুকে পড়েন। সেখানে ছিলেন তার স্ত্রী শাহিন আরা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মাহমুদা আকতার ও জামাতা মামুন। তাদের বেঁধে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মামুনের মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। দুপুর পর্যন্ত চলে এই তাণ্ডব।

হামলার দিন আজিজুল হক বাড়িতে ছিলেন না, চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে আসেন। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্যাতিতদের উদ্ধার করা হয়। সেদিন এক কাপড়ে সবাইকে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয়।
পরদিন সকালে আমিনবাজার সেনা ক্যাম্পে ডাকা হয় দুই পক্ষকে। ক্যাম্পে সবার বক্তব্য শুনে জ্যাকসন ও তার পরিবারকে ভর্ৎসনা করা হয়। আর নির্যাতিত পরিবারকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে একটি দরখাস্ত দিতে বলা হয়।
৭ মামলার ঘা
আজিজুল হকের জমিটি দখলে নিতে এ পর্যন্ত ৭টি মামলা করেছে জ্যাকসন ও তার পরিবার। ২০১৩ সালে প্রথম ফৌজদারি আইনে মামলা করেন জ্যাকসনের বাবা মর্তুজা ভূঁঞা। একই আইনে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মামলা করেন জ্যাকসন। দুটি মামলার রায়ই তাদের বিপক্ষে যায়। এরপর ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রিভিশন মামলা করা হয়। গত ৫ মার্চ আদালতের রায়ে সেটিও ‘নামঞ্জুর’ হয়।

জ্যাকসন, তার মা ও দুই ভাই গত ১০ মার্চ আজিজুল হক ও তার ৫ কন্যার বিরুদ্ধে ফেনী সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে ‘স্বত্ব ঘোষণা’র দাবি জানিয়ে মামলা করেন। মামলাটি এখনও চলছে। পরদিন ১১ মার্চ ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পঞ্চম মামলাটি হয়। ফৌজদারি আইনে এ মামলা করেন জ্যাকসনের মা নিলুফা আক্তার। তবে একই আইনে আগের দুটি মামলার মতো এটিও প্রত্যাহার হয়।
আবার ১৩ এপ্রিল আজিজুল হকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন নিলুফা আক্তার। সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল ফৌজদারি আইনে আরেকটি মামলা করেন জ্যাকসনের ভাই নাজমুল হোসেন। সেটি এখনো চলমান রয়েছে।
আজিজুল হকের মামলা
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আজিজুল হক ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর ১৪ আগস্ট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠক হয়। সেদিন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপার পর উভয় পক্ষকে নিজ নিজ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সালিশনামা মেনে নিয়ে জ্যাকসন তাতে স্বাক্ষরও করেন।
তবে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আজিজুল হক তার সীমানা প্রাচীর মেরামত করতে গেলে জ্যাকসনের লোকজন আবার বাধা দেয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, সেটিও আজিজুল হকের পক্ষে গেছে।
হামলা ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে আজিজুল হক ও তার বড় মেয়ে মরিয়ম আকতারের করা দুটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে।
৮ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন) সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেদিন তাদের লোকজন আমাদের উপরে হামলা করেছে। আমাদের পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। আমার আম্মা আহত হন। আমি এবং আমার ভাই আহত হই। ওইটা নিয়ে মামলা হয়েছে।
সালিশনামায় সমঝোতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির চৌহদ্দি নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। দলিলে যে চৌহদ্দি উল্লেখ আছে সেই অনুসারে তারা মানতে রাজি নন। পরে বনিবনা হয়নি দেখে কোর্টে মামলা করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনীর বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, আজিজুল হকের জমি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। এর তদন্ত চলছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

হামলার পর অজিজুল হক ওই বাড়িতে আর ফিরে যেতে পারেননি। আজ এক মেয়ের ঘরে, কাল আরেকজনের ঘরে তিনি দিন পার করছেন।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজের বাড়িতে উঠতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জানাতে পারে। জেলা প্রশাসক ভূমি আইনে তাদের বাড়িতে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য তারা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে আবেদন জানাতে পারেন।
আজিজুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের আগেও আমাকে হয়রানি করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে ‘আওয়ামী লীগ’ বানিয়েছে। আসলে আমি তো কোনো দলীয় রাজনীতি করি না। আমি সামান্য মানুষ, ইসলামের পথে চলি।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তৎকালীন ফেনী মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জয়নাল হাজারী আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। ওই সার্টিফিকেটই আমার জন্য যথেষ্ট। এটা দিয়ে আমি কোনো সুবিধা নেওয়ার চিন্তা করিনি।
প্রবীণ এই শিক্ষকের দাবি, জীবনের শেষ সময়টা তিনি নিজের জায়গায় নিরাপদে বসবাস করতে চান। প্রশাসন যেন তাকে সেই ব্যবস্থা করে দেয়।

দুই বোনের দোকান ভাঙচুর, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ







