পুরনো-নতুনের মিশ্রণে প্রাণবন্ত পাটুয়াটুলির চশমা পট্টি

পুরনো-নতুনের মিশ্রণে প্রাণবন্ত পাটুয়াটুলির চশমা পট্টি
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

বয়সের ভারে আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পান না ৭১ বছর বয়সী আবদুল মালেক। পত্রিকার ছোট অক্ষর কিংবা মোবাইলের লেখা পড়তে গেলেই চশমার প্রয়োজন হয়। তাই নতুন চশমা বানাতে আবারও এসেছেন পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে। নতুন ফ্রেমটি হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এখান থেকেই চশমা বানিয়ে নিই। দাম কম, জিনিস ভালো, তাই অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবিই না।’
আবদুল মালেকের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করেন ঐতিহ্যবাহী পাটুয়াটুলির চশমা পট্টিতে। যেখানে পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক ব্যবসার মিশেলে এখনো জমজমাট দেশের অন্যতম বৃহৎ চশমার বাজার।
পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পেরোলেই বাংলাবাজার মোড়ের ডানদিকে পাশাপাশি ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলির বাজার। এর মধ্যে ইসলামপুর দেশজুড়ে পরিচিত কাপড়ের জন্য, আর পাটুয়াটুলি বিখ্যাত চশমার পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে।
‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আড়তের গোড়াপত্তন ১৯৪৮ সালে, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে। ভারত–পাকিস্তান বিভক্তির পরপরই এখানে প্রথম চশমার দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময়ের চারটি দোকান কামাল অপটিক্যাল, প্যারাডাইস অপটিক্যাল, মেহবুব অপটিক্যাল ও চশমা ঘর আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
পাটুয়াটুলির প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে ‘কামাল অপটিক্যাল’। এখানে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছেন খোকন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন পাইকারি দরে মানসম্মত ফ্রেম কেনার জন্য।
তার ভাষায়, ‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
তার দাবি, তিনি কখনো-কখনো ক্রেতার সামর্থ্য বিবেচনা করে আরও কম দামেও ফ্রেম দিয়ে থাকেন।
এ বাজারে পাওয়া অধিকাংশ ফ্রেমই আমদানি করা হয় চীন থেকে। পাশাপাশি ভারত থেকেও এখন নিয়মিত আমদানি হয়। বিমান ও জাহাজ দুই পথেই আসে এসব পণ্য। ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকার ফ্রেম– সব দামের পণ্য মিলছে পাটুয়াটুলির দোকানগুলোতে।

১৯৪৮ সাল থেকেই সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে ‘রহমান অপটিক্যাল’। দোকানটিতে পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের বিক্রিই চলে। ক্রেতাদের প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
দোকানের বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, ‘খুচরা বিক্রিতে প্রতিটি ফ্রেমে প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে, আর পাইকারিতে লাভ হয় প্রায় ১০ টাকা। তবে পাইকারি পণ্য বিক্রি বেশি হওয়ায় দিনের শেষে মোট লাভই বেশি হয়।’
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
পাটুয়াটুলির সবচেয়ে প্রাচীন দোকানগুলোর একটি ‘মেহবুব অপটিক্যাল’। ৭২ বছরের পুরনো এই দোকানের কাঠের তাক, দেওয়ালের আঁচড় আর জীর্ণ অবস্থা যেন নিজেই তার বয়সের সাক্ষী। প্রতিষ্ঠাতারা আর বেঁচে নেই, এখন ব্যবসা তৃতীয় প্রজন্মের হাতে।
দোকানে কাজ করা আলমগীর ও নূর হোসেন জানালেন, একসময় পাটুয়াটুলিই ছিল দেশের একমাত্র চশমার বড় বাজার। মেহবুব অপটিক্যাল, কামাল অপটিক্যাল, ফ্যাশন অপটিক্যাল এসব দোকান থেকেই খুচরা ব্যবসায়ীরা ফ্রেম কিনতেন। এখন অনেক নতুন ব্যবসায়ী নিজেরাই সরাসরি চীন থেকে পণ্য আমদানি করেন। ফলে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমে গেছে। বরং অনেক সময় পুরনো দোকানগুলোই নতুনদের কাছ থেকে আধুনিক ডিজাইনের ফ্রেম কিনে থাকে।

চশমার পাশাপাশি আধুনিক নকশার সানগ্লাসও পাওয়া যায় পাটুয়াটুলিতে। শুক্রবার বাজারটির সাপ্তাহিক ছুটি। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এ যুগে এসেও হাতে গোনা কিছু দোকানে অনলাইন পেমেন্ট শুরু হয়েছে, যদিও ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ ক্রেতাই এখনো নগদ লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নন অভিজ্ঞ বিক্রেতারা। তাদের বিশ্বাস, চশমার বাজার হিসেবে পাটুয়াটুলির পরিচিতি কখনোই হারাবে না। ইংরেজ আমলের শেষদিকে শুরু হওয়া পাটুয়াটুলির চশমা ব্যবসা আজও পুরান ঢাকার এক অপরিহার্য অংশ। পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও এখানকার বিক্রেতাদের দাবি, ঐতিহ্য আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ধরে রেখেই এই বাজার থাকবে দেশের চশমা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকা এই আড়ত তাই এখনো ভরসার জায়গা হয়ে রয়েছে ক্রেতা–বিক্রেতা সবার কাছে।

বয়সের ভারে আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পান না ৭১ বছর বয়সী আবদুল মালেক। পত্রিকার ছোট অক্ষর কিংবা মোবাইলের লেখা পড়তে গেলেই চশমার প্রয়োজন হয়। তাই নতুন চশমা বানাতে আবারও এসেছেন পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে। নতুন ফ্রেমটি হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এখান থেকেই চশমা বানিয়ে নিই। দাম কম, জিনিস ভালো, তাই অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবিই না।’
আবদুল মালেকের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করেন ঐতিহ্যবাহী পাটুয়াটুলির চশমা পট্টিতে। যেখানে পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক ব্যবসার মিশেলে এখনো জমজমাট দেশের অন্যতম বৃহৎ চশমার বাজার।
পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পেরোলেই বাংলাবাজার মোড়ের ডানদিকে পাশাপাশি ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলির বাজার। এর মধ্যে ইসলামপুর দেশজুড়ে পরিচিত কাপড়ের জন্য, আর পাটুয়াটুলি বিখ্যাত চশমার পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে।
‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আড়তের গোড়াপত্তন ১৯৪৮ সালে, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে। ভারত–পাকিস্তান বিভক্তির পরপরই এখানে প্রথম চশমার দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময়ের চারটি দোকান কামাল অপটিক্যাল, প্যারাডাইস অপটিক্যাল, মেহবুব অপটিক্যাল ও চশমা ঘর আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
পাটুয়াটুলির প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে ‘কামাল অপটিক্যাল’। এখানে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছেন খোকন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন পাইকারি দরে মানসম্মত ফ্রেম কেনার জন্য।
তার ভাষায়, ‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
তার দাবি, তিনি কখনো-কখনো ক্রেতার সামর্থ্য বিবেচনা করে আরও কম দামেও ফ্রেম দিয়ে থাকেন।
এ বাজারে পাওয়া অধিকাংশ ফ্রেমই আমদানি করা হয় চীন থেকে। পাশাপাশি ভারত থেকেও এখন নিয়মিত আমদানি হয়। বিমান ও জাহাজ দুই পথেই আসে এসব পণ্য। ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকার ফ্রেম– সব দামের পণ্য মিলছে পাটুয়াটুলির দোকানগুলোতে।

১৯৪৮ সাল থেকেই সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে ‘রহমান অপটিক্যাল’। দোকানটিতে পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের বিক্রিই চলে। ক্রেতাদের প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
দোকানের বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, ‘খুচরা বিক্রিতে প্রতিটি ফ্রেমে প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে, আর পাইকারিতে লাভ হয় প্রায় ১০ টাকা। তবে পাইকারি পণ্য বিক্রি বেশি হওয়ায় দিনের শেষে মোট লাভই বেশি হয়।’
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
পাটুয়াটুলির সবচেয়ে প্রাচীন দোকানগুলোর একটি ‘মেহবুব অপটিক্যাল’। ৭২ বছরের পুরনো এই দোকানের কাঠের তাক, দেওয়ালের আঁচড় আর জীর্ণ অবস্থা যেন নিজেই তার বয়সের সাক্ষী। প্রতিষ্ঠাতারা আর বেঁচে নেই, এখন ব্যবসা তৃতীয় প্রজন্মের হাতে।
দোকানে কাজ করা আলমগীর ও নূর হোসেন জানালেন, একসময় পাটুয়াটুলিই ছিল দেশের একমাত্র চশমার বড় বাজার। মেহবুব অপটিক্যাল, কামাল অপটিক্যাল, ফ্যাশন অপটিক্যাল এসব দোকান থেকেই খুচরা ব্যবসায়ীরা ফ্রেম কিনতেন। এখন অনেক নতুন ব্যবসায়ী নিজেরাই সরাসরি চীন থেকে পণ্য আমদানি করেন। ফলে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমে গেছে। বরং অনেক সময় পুরনো দোকানগুলোই নতুনদের কাছ থেকে আধুনিক ডিজাইনের ফ্রেম কিনে থাকে।

চশমার পাশাপাশি আধুনিক নকশার সানগ্লাসও পাওয়া যায় পাটুয়াটুলিতে। শুক্রবার বাজারটির সাপ্তাহিক ছুটি। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এ যুগে এসেও হাতে গোনা কিছু দোকানে অনলাইন পেমেন্ট শুরু হয়েছে, যদিও ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ ক্রেতাই এখনো নগদ লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নন অভিজ্ঞ বিক্রেতারা। তাদের বিশ্বাস, চশমার বাজার হিসেবে পাটুয়াটুলির পরিচিতি কখনোই হারাবে না। ইংরেজ আমলের শেষদিকে শুরু হওয়া পাটুয়াটুলির চশমা ব্যবসা আজও পুরান ঢাকার এক অপরিহার্য অংশ। পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও এখানকার বিক্রেতাদের দাবি, ঐতিহ্য আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ধরে রেখেই এই বাজার থাকবে দেশের চশমা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকা এই আড়ত তাই এখনো ভরসার জায়গা হয়ে রয়েছে ক্রেতা–বিক্রেতা সবার কাছে।

পুরনো-নতুনের মিশ্রণে প্রাণবন্ত পাটুয়াটুলির চশমা পট্টি
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

বয়সের ভারে আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পান না ৭১ বছর বয়সী আবদুল মালেক। পত্রিকার ছোট অক্ষর কিংবা মোবাইলের লেখা পড়তে গেলেই চশমার প্রয়োজন হয়। তাই নতুন চশমা বানাতে আবারও এসেছেন পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে। নতুন ফ্রেমটি হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এখান থেকেই চশমা বানিয়ে নিই। দাম কম, জিনিস ভালো, তাই অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবিই না।’
আবদুল মালেকের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করেন ঐতিহ্যবাহী পাটুয়াটুলির চশমা পট্টিতে। যেখানে পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক ব্যবসার মিশেলে এখনো জমজমাট দেশের অন্যতম বৃহৎ চশমার বাজার।
পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পেরোলেই বাংলাবাজার মোড়ের ডানদিকে পাশাপাশি ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলির বাজার। এর মধ্যে ইসলামপুর দেশজুড়ে পরিচিত কাপড়ের জন্য, আর পাটুয়াটুলি বিখ্যাত চশমার পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে।
‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আড়তের গোড়াপত্তন ১৯৪৮ সালে, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে। ভারত–পাকিস্তান বিভক্তির পরপরই এখানে প্রথম চশমার দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময়ের চারটি দোকান কামাল অপটিক্যাল, প্যারাডাইস অপটিক্যাল, মেহবুব অপটিক্যাল ও চশমা ঘর আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
পাটুয়াটুলির প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে ‘কামাল অপটিক্যাল’। এখানে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছেন খোকন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন পাইকারি দরে মানসম্মত ফ্রেম কেনার জন্য।
তার ভাষায়, ‘পাটুয়াটুলিতে যে ফ্রেম ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, একই ফ্রেম বড় এবং স্থানীয় দোকানগুলো ২ হাজার টাকার নিচে দেয় না।’
তার দাবি, তিনি কখনো-কখনো ক্রেতার সামর্থ্য বিবেচনা করে আরও কম দামেও ফ্রেম দিয়ে থাকেন।
এ বাজারে পাওয়া অধিকাংশ ফ্রেমই আমদানি করা হয় চীন থেকে। পাশাপাশি ভারত থেকেও এখন নিয়মিত আমদানি হয়। বিমান ও জাহাজ দুই পথেই আসে এসব পণ্য। ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকার ফ্রেম– সব দামের পণ্য মিলছে পাটুয়াটুলির দোকানগুলোতে।

১৯৪৮ সাল থেকেই সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে ‘রহমান অপটিক্যাল’। দোকানটিতে পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের বিক্রিই চলে। ক্রেতাদের প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
দোকানের বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, ‘খুচরা বিক্রিতে প্রতিটি ফ্রেমে প্রায় ৪০ টাকা লাভ থাকে, আর পাইকারিতে লাভ হয় প্রায় ১০ টাকা। তবে পাইকারি পণ্য বিক্রি বেশি হওয়ায় দিনের শেষে মোট লাভই বেশি হয়।’
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
কাজী অপটিক্যালের বিক্রয়কর্মী জাকারিয়া অনিক জানান, পাটুয়াটুলির চশমা বাইরের দোকানে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু তারা দিনে এত বেশি বিক্রি করেন যে কম লাভেও মোট আয় দাঁড়িয়ে যায় বড় অঙ্কে। তার হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রি থেকেই তাদের মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী একদিনেই কয়েক হাজার পিস ফ্রেম নিয়ে যান, যা পাইকারি বিক্রির অঙ্ক আরও বড় করে।
পাটুয়াটুলির সবচেয়ে প্রাচীন দোকানগুলোর একটি ‘মেহবুব অপটিক্যাল’। ৭২ বছরের পুরনো এই দোকানের কাঠের তাক, দেওয়ালের আঁচড় আর জীর্ণ অবস্থা যেন নিজেই তার বয়সের সাক্ষী। প্রতিষ্ঠাতারা আর বেঁচে নেই, এখন ব্যবসা তৃতীয় প্রজন্মের হাতে।
দোকানে কাজ করা আলমগীর ও নূর হোসেন জানালেন, একসময় পাটুয়াটুলিই ছিল দেশের একমাত্র চশমার বড় বাজার। মেহবুব অপটিক্যাল, কামাল অপটিক্যাল, ফ্যাশন অপটিক্যাল এসব দোকান থেকেই খুচরা ব্যবসায়ীরা ফ্রেম কিনতেন। এখন অনেক নতুন ব্যবসায়ী নিজেরাই সরাসরি চীন থেকে পণ্য আমদানি করেন। ফলে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমে গেছে। বরং অনেক সময় পুরনো দোকানগুলোই নতুনদের কাছ থেকে আধুনিক ডিজাইনের ফ্রেম কিনে থাকে।

চশমার পাশাপাশি আধুনিক নকশার সানগ্লাসও পাওয়া যায় পাটুয়াটুলিতে। শুক্রবার বাজারটির সাপ্তাহিক ছুটি। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এ যুগে এসেও হাতে গোনা কিছু দোকানে অনলাইন পেমেন্ট শুরু হয়েছে, যদিও ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ ক্রেতাই এখনো নগদ লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নন অভিজ্ঞ বিক্রেতারা। তাদের বিশ্বাস, চশমার বাজার হিসেবে পাটুয়াটুলির পরিচিতি কখনোই হারাবে না। ইংরেজ আমলের শেষদিকে শুরু হওয়া পাটুয়াটুলির চশমা ব্যবসা আজও পুরান ঢাকার এক অপরিহার্য অংশ। পাটুয়াটুলির আধিপত্য কমলেও এখানকার বিক্রেতাদের দাবি, ঐতিহ্য আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ধরে রেখেই এই বাজার থাকবে দেশের চশমা বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকা এই আড়ত তাই এখনো ভরসার জায়গা হয়ে রয়েছে ক্রেতা–বিক্রেতা সবার কাছে।




