ঐতিহ্যের তাঁতিবাজারে স্বর্ণের ব্যবসা, দাম ওঠানামার প্রভাব বেচাকেনায়

ঐতিহ্যের তাঁতিবাজারে স্বর্ণের ব্যবসা, দাম ওঠানামার প্রভাব বেচাকেনায়
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার শতবর্ষী বাণিজ্যকেন্দ্র তাঁতিবাজার। নামের সঙ্গে ‘তাঁতি’ শব্দটি থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এই এলাকা দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে। বাজারটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর ও আধুনিক ব্যবসা– সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণ খাতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত ব্যবসায়ী, কারিগর ও ক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে তাঁতিবাজার।
ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলে তাঁতিবাজার এলাকায় মূলত তাঁতি বা বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বসবাস ও ব্যবসা করতেন। সেই থেকেই এলাকার নাম হয় ‘তাঁতিবাজার’। পরে ধীরে ধীরে তাঁতের ব্যবসা কমে গিয়ে স্বর্ণকার সম্প্রদায়ের ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকে। কয়েক দশকের ব্যবধানে এটি দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের পাইকারি বাজারে রূপ নেয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলার জুয়েলারি দোকানের একটি বড় অংশের অলংকার এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বংশাল পার হয়ে তাঁতিবাজার মোড় দিয়ে সরু গলিগুলোয় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি সোনার দোকান। কোথাও চলছে সোনা বিক্রি, কোথাও বন্ধক রাখা, আবার কোথাও দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অলংকার। ব্যস্ত এই গলিগুলোতেই প্রতিদিন চলে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ বাণিজ্যের কার্যক্রম।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। আর গতকাল সোমবার সেটার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর মাত্র তিনদিন আগেই ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে দামের এমন পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের মধ্যেই কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কমলেও বাজারে প্রত্যাশিত হারে বিক্রি বাড়েনি। অনেক ক্রেতাই আরও দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। আবার বিয়ের মৌসুম না থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যাও কিছুটা কম।
তাঁতিবাজারের শিবম গোল্ড অ্যান্ড সিলভার হাউজের স্বত্বাধিকারী শ্যামল সিং বলেন, ‘স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতারা এখন খুব হিসাব করে কিনছেন। আগে হঠাৎ দাম কমলে বিক্রি অনেক বেড়ে যেত, এখন সেই চিত্র নেই।’
শুধু ব্যবসাই নয়, তাঁতিবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু কারিগরের জীবনগাঁথা। এখানকার অনেক কারিগর ছোটবেলা থেকেই মহাজন ও ওস্তাদদের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন। পরিবার থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।

তাঁতিবাজারের স্বর্ণকার নারায়ণ কর্মকার বলেন,‘এখানকার অধিকাংশ কারিগরই কারখানাতেই বসবাস করেন। নিচতলায় দোকান, আর পুরোনো ভবনগুলোর ভেতরেই রয়েছে কারখানা। সারাদিন কাজ শেষে সেখানেই রাত কাটাই আমরা। অনেকের পুরো জীবনই কেটে যায় এই তাঁতিবাজারে। আমার দাদা, বাবা সবার পেশাই ছিল স্বর্ণকারের। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে আমিও এই পেশায় আছি। সোনা আর গহনা তৈরির কাজই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
কারিগর সংকট প্রসঙ্গে কারিগর স্বরূপ চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘এখন অনেকেই এই পেশায় আসতে চায় না। গ্রামে দিনমজুরের কাজ করেও অনেক সময় বেশি আয় করা যায়। আমাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। কাজের পরিমাণের ওপর আয় নির্ভর করে। থাকা ছাড়া অন্য সব খরচ নিজেদের বহন করতে হয়। মাস শেষে পরিবারের জন্য খুব বেশি টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না।’
সোনা কিনতে আসা কুমিল্লার ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রায় প্রতি মাসেই তাঁতিবাজারে আসি। আমাদের জেলার দোকানের জন্য বেশির ভাগ গয়নাই এখান থেকে সংগ্রহ করি। এখানে বিভিন্ন ডিজাইনের অলংকার পাওয়া যায় এবং কারিগররাও খুব দক্ষ। তবে স্বর্ণের দামে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে এখন আগের মতো বেশি পরিমাণে মাল তোলা যায় না। বাজার পরিস্থিতি বুঝে হিসাব করে কিনতে হচ্ছে।’
তাঁতিবাজারে সোনা কেনাবেচার পাশাপাশি স্বর্ণ বন্ধক রাখার ব্যবস্থাও বেশ জনপ্রিয়। বাজারের অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সামনেই ‘এখানে স্বর্ণ বন্ধক রাখা হয়’ এমন সাইনবোর্ডও দেখা যায়।
এ বিষয়ে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সাগর দাস বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়লে তিনি তার স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিতে পারেন। পরে টাকা পরিশোধ করে আবার সেই স্বর্ণ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দক্ষ কারিগরের শ্রম এবং দেশের স্বর্ণ ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার আজও তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কারিগর তৈরি, স্বর্ণ আমদানিতে স্বচ্ছ নীতিমালা এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁতিবাজারকে কেন্দ্র করে দেশের স্বর্ণশিল্প আরও বিকশিত হতে পারে।

পুরান ঢাকার শতবর্ষী বাণিজ্যকেন্দ্র তাঁতিবাজার। নামের সঙ্গে ‘তাঁতি’ শব্দটি থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এই এলাকা দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে। বাজারটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর ও আধুনিক ব্যবসা– সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণ খাতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত ব্যবসায়ী, কারিগর ও ক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে তাঁতিবাজার।
ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলে তাঁতিবাজার এলাকায় মূলত তাঁতি বা বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বসবাস ও ব্যবসা করতেন। সেই থেকেই এলাকার নাম হয় ‘তাঁতিবাজার’। পরে ধীরে ধীরে তাঁতের ব্যবসা কমে গিয়ে স্বর্ণকার সম্প্রদায়ের ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকে। কয়েক দশকের ব্যবধানে এটি দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের পাইকারি বাজারে রূপ নেয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলার জুয়েলারি দোকানের একটি বড় অংশের অলংকার এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বংশাল পার হয়ে তাঁতিবাজার মোড় দিয়ে সরু গলিগুলোয় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি সোনার দোকান। কোথাও চলছে সোনা বিক্রি, কোথাও বন্ধক রাখা, আবার কোথাও দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অলংকার। ব্যস্ত এই গলিগুলোতেই প্রতিদিন চলে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ বাণিজ্যের কার্যক্রম।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। আর গতকাল সোমবার সেটার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর মাত্র তিনদিন আগেই ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে দামের এমন পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের মধ্যেই কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কমলেও বাজারে প্রত্যাশিত হারে বিক্রি বাড়েনি। অনেক ক্রেতাই আরও দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। আবার বিয়ের মৌসুম না থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যাও কিছুটা কম।
তাঁতিবাজারের শিবম গোল্ড অ্যান্ড সিলভার হাউজের স্বত্বাধিকারী শ্যামল সিং বলেন, ‘স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতারা এখন খুব হিসাব করে কিনছেন। আগে হঠাৎ দাম কমলে বিক্রি অনেক বেড়ে যেত, এখন সেই চিত্র নেই।’
শুধু ব্যবসাই নয়, তাঁতিবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু কারিগরের জীবনগাঁথা। এখানকার অনেক কারিগর ছোটবেলা থেকেই মহাজন ও ওস্তাদদের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন। পরিবার থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।

তাঁতিবাজারের স্বর্ণকার নারায়ণ কর্মকার বলেন,‘এখানকার অধিকাংশ কারিগরই কারখানাতেই বসবাস করেন। নিচতলায় দোকান, আর পুরোনো ভবনগুলোর ভেতরেই রয়েছে কারখানা। সারাদিন কাজ শেষে সেখানেই রাত কাটাই আমরা। অনেকের পুরো জীবনই কেটে যায় এই তাঁতিবাজারে। আমার দাদা, বাবা সবার পেশাই ছিল স্বর্ণকারের। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে আমিও এই পেশায় আছি। সোনা আর গহনা তৈরির কাজই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
কারিগর সংকট প্রসঙ্গে কারিগর স্বরূপ চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘এখন অনেকেই এই পেশায় আসতে চায় না। গ্রামে দিনমজুরের কাজ করেও অনেক সময় বেশি আয় করা যায়। আমাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। কাজের পরিমাণের ওপর আয় নির্ভর করে। থাকা ছাড়া অন্য সব খরচ নিজেদের বহন করতে হয়। মাস শেষে পরিবারের জন্য খুব বেশি টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না।’
সোনা কিনতে আসা কুমিল্লার ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রায় প্রতি মাসেই তাঁতিবাজারে আসি। আমাদের জেলার দোকানের জন্য বেশির ভাগ গয়নাই এখান থেকে সংগ্রহ করি। এখানে বিভিন্ন ডিজাইনের অলংকার পাওয়া যায় এবং কারিগররাও খুব দক্ষ। তবে স্বর্ণের দামে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে এখন আগের মতো বেশি পরিমাণে মাল তোলা যায় না। বাজার পরিস্থিতি বুঝে হিসাব করে কিনতে হচ্ছে।’
তাঁতিবাজারে সোনা কেনাবেচার পাশাপাশি স্বর্ণ বন্ধক রাখার ব্যবস্থাও বেশ জনপ্রিয়। বাজারের অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সামনেই ‘এখানে স্বর্ণ বন্ধক রাখা হয়’ এমন সাইনবোর্ডও দেখা যায়।
এ বিষয়ে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সাগর দাস বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়লে তিনি তার স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিতে পারেন। পরে টাকা পরিশোধ করে আবার সেই স্বর্ণ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দক্ষ কারিগরের শ্রম এবং দেশের স্বর্ণ ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার আজও তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কারিগর তৈরি, স্বর্ণ আমদানিতে স্বচ্ছ নীতিমালা এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁতিবাজারকে কেন্দ্র করে দেশের স্বর্ণশিল্প আরও বিকশিত হতে পারে।

ঐতিহ্যের তাঁতিবাজারে স্বর্ণের ব্যবসা, দাম ওঠানামার প্রভাব বেচাকেনায়
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার শতবর্ষী বাণিজ্যকেন্দ্র তাঁতিবাজার। নামের সঙ্গে ‘তাঁতি’ শব্দটি থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এই এলাকা দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে। বাজারটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগর ও আধুনিক ব্যবসা– সব মিলিয়ে দেশের স্বর্ণ খাতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত ব্যবসায়ী, কারিগর ও ক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে তাঁতিবাজার।
ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলে তাঁতিবাজার এলাকায় মূলত তাঁতি বা বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বসবাস ও ব্যবসা করতেন। সেই থেকেই এলাকার নাম হয় ‘তাঁতিবাজার’। পরে ধীরে ধীরে তাঁতের ব্যবসা কমে গিয়ে স্বর্ণকার সম্প্রদায়ের ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকে। কয়েক দশকের ব্যবধানে এটি দেশের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের পাইকারি বাজারে রূপ নেয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলার জুয়েলারি দোকানের একটি বড় অংশের অলংকার এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বংশাল পার হয়ে তাঁতিবাজার মোড় দিয়ে সরু গলিগুলোয় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি সোনার দোকান। কোথাও চলছে সোনা বিক্রি, কোথাও বন্ধক রাখা, আবার কোথাও দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অলংকার। ব্যস্ত এই গলিগুলোতেই প্রতিদিন চলে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ বাণিজ্যের কার্যক্রম।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। আর গতকাল সোমবার সেটার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর মাত্র তিনদিন আগেই ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে দামের এমন পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ের মধ্যেই কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কমলেও বাজারে প্রত্যাশিত হারে বিক্রি বাড়েনি। অনেক ক্রেতাই আরও দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। আবার বিয়ের মৌসুম না থাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যাও কিছুটা কম।
তাঁতিবাজারের শিবম গোল্ড অ্যান্ড সিলভার হাউজের স্বত্বাধিকারী শ্যামল সিং বলেন, ‘স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতারা এখন খুব হিসাব করে কিনছেন। আগে হঠাৎ দাম কমলে বিক্রি অনেক বেড়ে যেত, এখন সেই চিত্র নেই।’
শুধু ব্যবসাই নয়, তাঁতিবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু কারিগরের জীবনগাঁথা। এখানকার অনেক কারিগর ছোটবেলা থেকেই মহাজন ও ওস্তাদদের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন। পরিবার থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।

তাঁতিবাজারের স্বর্ণকার নারায়ণ কর্মকার বলেন,‘এখানকার অধিকাংশ কারিগরই কারখানাতেই বসবাস করেন। নিচতলায় দোকান, আর পুরোনো ভবনগুলোর ভেতরেই রয়েছে কারখানা। সারাদিন কাজ শেষে সেখানেই রাত কাটাই আমরা। অনেকের পুরো জীবনই কেটে যায় এই তাঁতিবাজারে। আমার দাদা, বাবা সবার পেশাই ছিল স্বর্ণকারের। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে আমিও এই পেশায় আছি। সোনা আর গহনা তৈরির কাজই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
কারিগর সংকট প্রসঙ্গে কারিগর স্বরূপ চন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘এখন অনেকেই এই পেশায় আসতে চায় না। গ্রামে দিনমজুরের কাজ করেও অনেক সময় বেশি আয় করা যায়। আমাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। কাজের পরিমাণের ওপর আয় নির্ভর করে। থাকা ছাড়া অন্য সব খরচ নিজেদের বহন করতে হয়। মাস শেষে পরিবারের জন্য খুব বেশি টাকা পাঠানো সম্ভব হয় না।’
সোনা কিনতে আসা কুমিল্লার ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রায় প্রতি মাসেই তাঁতিবাজারে আসি। আমাদের জেলার দোকানের জন্য বেশির ভাগ গয়নাই এখান থেকে সংগ্রহ করি। এখানে বিভিন্ন ডিজাইনের অলংকার পাওয়া যায় এবং কারিগররাও খুব দক্ষ। তবে স্বর্ণের দামে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে এখন আগের মতো বেশি পরিমাণে মাল তোলা যায় না। বাজার পরিস্থিতি বুঝে হিসাব করে কিনতে হচ্ছে।’
তাঁতিবাজারে সোনা কেনাবেচার পাশাপাশি স্বর্ণ বন্ধক রাখার ব্যবস্থাও বেশ জনপ্রিয়। বাজারের অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সামনেই ‘এখানে স্বর্ণ বন্ধক রাখা হয়’ এমন সাইনবোর্ডও দেখা যায়।
এ বিষয়ে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সাগর দাস বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়লে তিনি তার স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিতে পারেন। পরে টাকা পরিশোধ করে আবার সেই স্বর্ণ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকে।’
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দক্ষ কারিগরের শ্রম এবং দেশের স্বর্ণ ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার আজও তার গুরুত্ব ধরে রেখেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কারিগর তৈরি, স্বর্ণ আমদানিতে স্বচ্ছ নীতিমালা এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁতিবাজারকে কেন্দ্র করে দেশের স্বর্ণশিল্প আরও বিকশিত হতে পারে।

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কতো


