শিরোনাম

পোশাক বাজারে ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

পোশাক বাজারে ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ
পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকরা কাজ করছেন

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত তৈরি পোশাকশিল্প। ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই শ্রমিক অসন্তোষ, গ্যাস সংকটসহ বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং প্রধান বাজারগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে এ খাতের সংকট বেড়েছে। এতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখার কৃতিত্ব দেখাল বাংলাদেশ।

তবে বিশ্ব পোশাক রপ্তানির বাজারে দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময়ের চাঙ্গা ভাব কাটিয়ে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি থমকে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে দ্রুত গতিতে, সেখানে বাংলাদেশ হেঁটেছে উল্টো পথে।

২০২০ সালে অতিমারি করোনাকালে বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নিয়েছিল ভিয়েতনাম। পরের বছর ২০২১ সালে ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করে বাংলাদেশ। তৃতীয় অবস্থানে চলে যায় ভিয়েতনাম। ২৪ এবং ২৫ সালের প্রতিবেদনেও পোশাক রপ্তানিতে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশটি। পোশাক রপ্তানিতে বরাবরের মতো এবারও প্রথম স্থানে আছে চীন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখলেও বৈশ্বিক হিস্যা কমেছে বাংলাদেশের। আগের বছরের হিস্যা ৭ শতাংশ থেকে কমে গত বছর এ হার ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে হিস্যা ছিল ৭ শতাংশ। এ হিস্যা ইস্যুতে কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে।

বিগত বছরের দুর্দান্ত সাফল্যকে পেছনে ফেলে ২০২৫ সালে এসে দেশের প্রধান এই আয়কারী খাতটি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ ধীর গতিতে এগিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বা মার্কেট শেয়ার যেমন কমেছে, ঠিক তেমনি ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলছে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের তৈরি এক বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, চীন থেকে চলে যাওয়া ক্রয়াদেশের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ পেলেও প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ এক্ষেত্রে আরও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। তারা মনে করছেন, নীতিগত সহায়তা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বাড়াতে না পারলে বিশ্ববাজারের এই কঠিন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা আগামী দিনে আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল সিটিজেন জার্নালকে জানান, বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা এবং মূল্যচাপ এখনো বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লিড টাইম এবং অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করা গেলে বাংলাদেশ আরও ভালো করবে।

তিনি বলেন, সরবরাহের পরিমাণ কম মূলত রপ্তানি হ্রাসের মূল কারণ; তবে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে।

বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে পাঁচ গুণ পিছিয়ে বাংলাদেশ

২০২৪ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় ৩ গুণ বেশি গতিতে এগিয়েছিল বাংলাদেশের পোশাক খাত। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে সেই চিত্রে বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছে। এই বছরে বিশ্বজুড়ে পোশাক রপ্তানিতে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৪৬ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ— যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

কমেছে মার্কেট শেয়ার, হারিয়েছে আগের অর্জন

প্রবৃদ্ধির এই মন্থর গতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বা মার্কেট শেয়ার কমেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার যেখানে বেড়ে ৭.০০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ, এক বছরেই দেশ ০.২৪ শতাংশ পয়েন্ট শেয়ার হারিয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সালে অর্জন করা মোট শেয়ার বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আবার হাতছাড়া হয়ে গেল।

ঘাড়ের ওপর ভিয়েতনামের নিশ্বাস

বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি মূল্যের ব্যবধান এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ছিল ৩৮.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে তা দাঁড়িয়েছে ৩৭.৫১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যকার আয়ের ব্যবধান এখন মাত্র ১.৩১ বিলিয়ন ডলার। অথচ এই ব্যবধান ২০২৩ সালে ৪.৬৭ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালেও ২.৫৪ বিলিয়ন ডলার ছিল।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভিয়েতনামের শেয়ার ৬.৫৩ শতাংশ, যা বাংলাদেশের (৬.৭৬%) চেয়ে মাত্র ০.২৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা (ভিয়েতনামের ১০.৫৩% বনাম বাংলাদেশের ০.৮৯%) যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০২৬ সালের মধ্যেই ভিয়েতনাম পোশাক রপ্তানির মূল্যে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নেবে।

চীনের পতন কিন্তু সুবিধা নিচ্ছে অন্য দেশ

দীর্ঘদিন ধরে পোশাক বাজারে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, চীন তার মার্কেট শেয়ার হারালে সেই সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ পাবে। তবে ২০২৫ সালের তথ্য এই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত করেছে। আলোচিত বছর চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪.৯২ শতাংশ। কিন্তু চীন বাজার হারালেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। উল্টো চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজার লুফে নিয়েছে কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম। এই বছর কম্বোডিয়া ১৬.৮৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ১০.৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, যেখানে বাংলাদেশ রয়ে গেছে প্রায় স্থবির।

পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা

দেশীয় বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাড়াতে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্রখাতে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার বিকল্প হিসেবে দেওয়া নগদ সহায়তার হার এক ধাক্কায় তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে যা তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তার ঘোষিত হার ১.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ঘোষণা অনুযায়ী, বর্ধিত এই নগদ সহায়তা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জাহাজীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই প্রণোদনার ফলে রপ্তানিকারকরা বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সুতা ও কাপড় ব্যবহারে বেশি আগ্রহী হবেন, যা স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়াতে এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।

/এমআর/