শিরোনাম

নন-ফান্ডেড দায় ঋণে রূপান্তর, ট্রেড ফাইন্যান্সে বাড়ছে খেলাপি ঋণ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
নন-ফান্ডেড দায় ঋণে রূপান্তর, ট্রেড ফাইন্যান্সে বাড়ছে খেলাপি ঋণ
কর্মশালা বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামসহ অন্যরা।

নন-ফান্ডেড দায় জোরপূর্বক ঋণে রূপান্তরিত হওয়া ট্রেড ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, তুলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল, চিনি ও সার জাতীয় পণ্য, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিসংক্রান্ত ট্রেড ফাইন্যান্সে এ ধরনের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সম্পদের গুণগত মান অবনতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) একটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।

বুধবার (৮ জুলাই) মিরপুরস্থ নিজস্ব ক্যাম্পাসে ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক একটি রিভিউ ওয়ার্কশপ আয়োজন করে। কর্মশালায় দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ট্রেড ফাইন্যান্স খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।

কর্মশালায় গবেষণা দলের পক্ষে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রেড ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য এক্সপোজার রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনায় দেখা গেছে যে, ট্রেড-সংশ্লিষ্ট ঋণ পোর্টফোলিওতে সম্পদের গুণগত মানের ওপর চাপ ইতোমধ্যেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যাংকগুলোর ট্রেড ফাইন্যান্স-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ।

অন্যদিকে, যেসব ব্যাংকে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেশি এবং একই সঙ্গে ট্রেড ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য এক্সপোজার রয়েছে, সেসব ব্যাংকে ট্রেড ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, নন-ফান্ডেড দায় জোরপূর্বক ঋণে রূপান্তরিত হওয়া ট্রেড ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, তুলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল, চিনি ও সারজাতীয় পণ্য, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিসংক্রান্ত ট্রেড ফাইন্যান্সে এ ধরনের ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সম্পদের গুণগত মান অবনতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গবেষণায় রপ্তানি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। মতামত জরিপে প্রায় সব ব্যাংকারই মনে করেন, আইনগতভাবে কার্যকর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহারের ফলে রপ্তানি অর্থায়নে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি মূলত নিশ্চিত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যদি এর ভিত্তি হিসেবে থাকা চুক্তি দুর্বল, বিতর্কিত বা আইনগতভাবে কার্যকর না হয়, তবে পুরো অর্থায়ন প্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে রপ্তানি আয় সময়মতো না এলে বা আদায় না হলে ট্রেড ফাইন্যান্সের স্বয়ং-পরিশোধযোগ্য বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যায় এবং তা দ্রুত জোরপূর্বক ঋণে পরিণত হয়ে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রমকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে ইলেকট্রনিক ট্রেড ডকুমেন্টের জন্য আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গ্রাহকসেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি পণ্যভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর ট্রেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি।

গবেষণাপত্রটি যৌথভাবে প্রস্তুত করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব, সহকারী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ও রাহাত বানু, প্রভাষক রাজিব কুমার দাস, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আরাফাত আলী এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ.টি.এম. নেছারুল হক।

কর্মশালায় আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর ও এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান, সিডিসিএস, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাজ্জাদ হায়দার চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।

পরে অনুষ্ঠিত মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা ট্রেড ফাইন্যান্স কার্যক্রমের আধুনিকায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের গুণগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।

/এফআর/