শিরোনাম
দুর্যোগে এইচএসসি পরীক্ষা

শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

টানা ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা চালু রাখার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ছাত্রনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

সোমবার (১৩ জুলাই) দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

এদিকে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে কিছু এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং দেশের অন্যান্য অংশে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে উপস্থিত হন। কিন্তু কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। কোথাও নৌকা, কোথাও ভ্যান কিংবা স্থানীয়দের সহায়তায় পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের প্রবেশপথে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ছাতা মাথায় ভেজা পোশাকেই তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

পরীক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা সরকারের সমালোচনা করেছেন। এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়ে পুরো শরীর ভিজিয়ে কেন্দ্রে গেছে। জুতা-মোজা ভিজে গেছে। এমন অবস্থায় একজন শিক্ষার্থী কীভাবে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দেবে? বাচ্চারা ট্রমার মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখার মতো কেউ নেই।’

অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনায় সরব হয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও। চিকিৎসক ও সামাজিক কর্মী সাদিকুর রহমান সাদাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল পরীক্ষা পেছানোর জন্য। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে নেমে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অমানবিক সিদ্ধান্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করার ফলে অনেকের মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, যা পরীক্ষার ফলাফলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলম ফেসবুকে লেখেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাইফ টাইম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারবেনা।’

এছাড়া ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিমসহ বিভিন্ন ছাত্রনেতা এবং অসংখ্য নেটিজেনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন।

পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রশক্তি ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠন দুটির নেতারা বলেছেন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে লাখো পরীক্ষার্থী চরম ভোগান্তির মধ্যে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের অবিচার। এমন জাতীয় সংকটের মুহূর্তে বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরীক্ষা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। তাই চলমান এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

শিক্ষাবিদরাও সরকারের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফ সাদিক সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘মানুষের জীবন বাঁচানো বেশি জরুরি। যেখানে মানুষ বন্যা ও দুর্যোগের কারণে নিরাপদে চলাফেরা পর্যন্ত করতে পারছে না, সেখানে পরীক্ষা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে পরীক্ষা আয়োজন করার চেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখাই ছিল অধিক মানবিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, তবে মানুষের জীবন তার চেয়েও মূল্যবান।’

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

/এফআর/