শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের বড় ধাক্কা

সিটিজেন ডেস্ক
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের বড় ধাক্কা
ইরান যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে।

চলমান মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট তীব্র বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে একটি নতুন ঋণ ও সহায়তা কর্মসূচির আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার কারণে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির ঢাকা মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার।

এক বিবৃতিতে তিনি জানান, আইএমএফের প্রতিনিধি দল বর্তমানে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের নীতিগত অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিশদ আলোচনা করছে। দীর্ঘস্থায়ী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করতে সংস্থাটি বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের বড় ধাক্কা (1)
দেশের পোশাক শিল্পেও পড়েছে ইরান যুদ্ধের প্রভাব।

যদিও নতুন আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা শর্তাবলি কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি, তবে এর আগে গত মার্চ মাসে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন বৈশ্বিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়ার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলের সামরিক হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি যুদ্ধপূর্ব ৬৬ ডলার থেকে লাফিয়ে প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও একটি টেকসই শান্তি চুক্তি এখনো অধরা রয়ে গেছে। উপরন্তু, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ জারির ফলে এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশই আমদানি করে, যা বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে তীব্র চাহিদার মুখে পড়ে। এই বিপুল আমদানির একটি বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

জ্বালানি আমদানির আকাশচুম্বী ব্যয় সামলাতে ঢাকা ইতোমধ্যে সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রাখাসহ নানা সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, ১৯ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফলে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ০.৯৫ ডলার থেকে বেড়ে ১.১০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। তবে যুদ্ধকালীন সংকটের প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এর ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় চীন থেকে পোশাক খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির খরচ ও সময় উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্কয়ার ডেনিমের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মৌসুমে পোশাকের ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। এমনকি গত মার্চে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বাতিল করায় জারার মালিক ইন্ডিটেক্সসহ অন্যান্য প্রধান পোশাক বিক্রেতাদের জন্য নির্ধারিত তৈরি পোশাকের চালানগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে আটকে পড়েছিল। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় প্লাস্টিক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল রেজিনের দাম টনপ্রতি ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১৫০০ থেকে ১৬০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা অন্যান্য শিল্প খাতকেও সংকটের মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের বড় ধাক্কা (2)

আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ও বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমানে দেশটির জন্য একটি মাঝারি কিন্তু ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবং ঋণ পরিশোধের উচ্চ চাপ তৈরি করেছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসআই-এর তথ্যমতে, গত ত্রৈমাসিকের ১১২.২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ১১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ ২০২৪ সালেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ সংকটের ক্ষেত্রে স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করেছিল, কারণ তখন ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ সূচকের বড় ধরনের অবনতি ঘটতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ৪ বছর মেয়াদী ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি আইএমএফ কর্মসূচির মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন একটি কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে ঐকমত্য হয়।

তাছাড়া, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বিশ্বব্যাংকও সম্প্রতি বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করেছে। মহামারী ও জলবায়ু দুর্যোগের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই এ যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোর ঋণ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। আইএমএফ সতর্ক করেছে, এ যুদ্ধাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে ঋণের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত বছর বৈশ্বিক সরকারি ঋণ বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এটি ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের পর আর দেখা যায়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/