শিরোনাম

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে গভীর সংকটের আভাস


বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে গভীর সংকটের আভাস
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মেঘ কাটতে না কাটতেই সাধারণ মানুষের কাঁধে চেপে বসলো বিদ্যুতের বাড়তি মূল্যের বোঝা। সরকারের নির্বাহী আদেশে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। পাইকারি ও খুচরা-উভয় স্তরেই এই মূল্যবৃদ্ধি ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। একদিকে তীব্র মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে ইতোমধ্যেই সংকটে জর্জরিত শিল্প খাত। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের দাম কেন বাড়ল

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বাস্তবতা দেখিয়ে সেই আশ্বাস রাখতে পারেনি। সবশেষ গত এপ্রিলে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাবে বেড়েছে গাড়ি ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচ। এর মধ্যেই জুনে আবার বেড়েছে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম।

বুধবার বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই নতুন দাম জুনের প্রথম দিন থেকেই দিতে হবে গ্রাহকদের। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬ দশমকি ৬৮ শতাংশ। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় ৬০ শতাংশ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে-আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামাল দিতে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক চাপ।

তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারের ভর্তুকির বোঝা কিছুটা কমলেও এর প্রধান ভার বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অনিয়মের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির বোঝা জনগণের ওপর চাপানো উচিত নয়। ঘাটতির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে অপচয় ও অদক্ষতা দূর করার পরই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত সোমবার জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই সুবিধাও দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

খাতভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধি: কার পকেট থেকে কত যাচ্ছে

এবারের মূল্যবৃদ্ধিতে বাণিজ্যিক থেকে শুরু করে শিল্প-সব খাতের গ্রাহকদেরই বাড়তি বিল গুনতে হচ্ছে। গড়ে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে আট শতাংশ। আবাসিকে দাম বাড়ালেও আজ বৃহস্পতিবার তা আবার আগের জায়গায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওা হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বুধবার (৩ জুন) বিইআরসি ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করেb।

জানা গেছে, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা (১৬.৬৮ শতাংশ) বেড়েছে। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ধাপে সর্বোচ্চ ১৯.৯৪ শতাংশ পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা/কোম্পানির আবাসিক গ্রাহকশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত লাইফ লাইনের নতুন বিদ্যুতের দাম প্রান্তিক গ্রাহকদের (০ থেকে ৫০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট আগের দামই কার্যকর হবে। অর্থাৎ ৪ টাকা ৬৩ পয়সা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম ধাপ বা আবাসিক প্রথম ধাপের (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) আগের দামে অর্থাৎ প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে গত ৩ জুন বিইআরসি বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে। এতে আবাসিক লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে পাঁচ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। একইসঙ্গে প্রথম ধাপে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পাঁচ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ১৮ পয়সা করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ (৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা, তৃতীয় ধাপ (২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১০ পয়সা, চতুর্থ ধাপ (৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট), প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা, পঞ্চম ধাপ (৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট ১৫ টাকা ০১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপ (৬০০ ইউনিটের ওপরে) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১৫ থেকে ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া সঞ্চালন চার্জও ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব

বাংলাদেশের জিডিপি এবং কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি হলো শিল্প খাত। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বাড়বে। এতে এই খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: দেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত (রড), সিমেন্ট এবং সিরামিক শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ বিদ্যুৎনির্ভর। ভারী শিল্পে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি প্রায় ৮২ পয়সা বাড়ায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর (যেমন ভিয়েতনাম বা ভারত) তুলনায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সংকট

বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুরো কোনোমতে ধাক্কা সামলে নিলেও সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা। তাদের জন্য বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ৮.৩৫ শতাংশ বেড়েছে। অনেক ছোট কারখানা বিদ্যুৎ বিলের এই বাড়তি খরচ সামলাতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে।

বিনিয়োগে মন্দা: বিদ্যুতের দাম বারবার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বিাড়ে। কারণ, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা যখন দেখেন যে জ্বালানি খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

বিপন্ন জনজীবন

বিদ্যুতের দাম সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং গুণগত মানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিদ্যুতে এবারের মূল্যবৃদ্ধি জীবনের যেসব বিষয়কে সংকটে ফেলবে সেগুলো হচ্ছে;

সংসার খরচে টান: প্রথমত সরাসরি আবাসিক বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বাবদ ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত (ব্যবহার ভেদে) অতিরিক্ত খরচ করতে হবে। যেমন ৬০০ ইউনিটের বেশি যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন তাদের ইউনিট প্রতি তাদের ১৭ দশমিক ৩৫ পয়সা বিল দিতে হবে। নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবী বা নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের কোনো অংশ না বাড়লেও, এই বাড়তি বিল তাদের অন্যান্য জরুরি খরচ (যেমন পুষ্টিকর খাবার বা চিকিৎসা) কমাতে বাধ্য করবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় খুচরা দোকানদার, সুপারশপ এবং কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন। হিমাগারের বিদ্যুৎ বিল বাড়ার কারণে আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পচনশীল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বছরজুড়েই চড়া থাকবে।

ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বহুতল ভবনে পানি তোলার পাম্প, লিফট এবং করিডোরের আলো জ্বালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে। ফ্ল্যাটগুলোর সার্ভিস চার্জ এবং ওয়াসার পানি তোলার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করবেন, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হবে ভাড়াটিয়ারা।

কৃষি ও সেচ খাতে প্রভাব: যদিও সেচ কাজে বিদ্যুতে কিছুটা রেয়াত দেওয়া হয়, তবুও প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। ধান চাষে সেচ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেচ খরচ বাড়ার কারণে চালের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা বাজারে চালের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং কোচিং সেন্টারগুলোর পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে টিউশন ফির ওপর। অন্যদিকে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ২৪ ঘণ্টা এসি, আইসিইউ এবং ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম চালাতে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই বিল বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা এবং প্যাথলজিক্যাল টেস্টের খরচ আরও এক ধাপ বাড়বে।

পরিষেবা ও আবাসন খাত: আবাসন খাতের ফ্ল্যাটের চাহিদা কমতে পারে। কারণ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এখন থেকে অনেকটাই বেড়ে যাবে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাত বা ফ্রিল্যান্সার যারা ঘরে বসে কাজ করেন, তাদেরও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণ এবং বিদ্যুৎ খাতের লোকসান বা ভর্তুকি কমাতে সরকারের সামনে হয়তো বিকল্প কম ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন সীমিত, তখন এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে এক ধরনের শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। শিল্পোৎপাদন সচল রাখতে এবং জনজীবনকে স্বস্তি দিতে সরকারের উচিত হবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সিস্টেম লস কমানো, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি রোধ করা এবং অপচয় বন্ধে কঠোর হওয়া। অন্যথায়, এই বাড়তি দামের বোঝা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আপত্তি

জ্বালানির পর বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনায় দেশের শিল্প খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা এবার দাম বাড়াসেনার বিষয়ে জোরোলো আপত্তি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমানে শিল্প খাত স্রেফ টিকে থাকার লড়াই করছে। এই মুহূর্তে যদি নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তবে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যদিও সরকার যৌক্তিকভাবেই বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি সরকার আরেক দফা তেলের দাম বাড়িয়েছে। সেখানে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি, কারণ সরাসরি সাধারণ জনগণের উপরে প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ যে কারণে সরকার ডিজেলের দাম বাড়ায়নি, ঠিক একই কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ঠিক না বলে আমরা মনে করি।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সরাসরি সাধারণ জনগণ এবং উৎপাদন খাত- উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে হলেও বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে বিইআরসির কাছে সাত দফা দাবি দিয়েছে। বিএসএমএ বলেছে, বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে শিল্প খাত, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারী শিল্প, বিশেষ করে স্টিল মিলগুলোকে সচল রাখতে কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। বর্তমানে আরোপিত অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ বাতিল করতে হবে এবং অতিরিক্ত ভ্যাটের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। পাওয়ার ফ্যাক্টরের ওপর ভিত্তি করে যে অতিরিক্ত জরিমানা বা চার্জ আদায় করা হয়, তা যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ব্যবসায়ীরা আরো বলেন,বিদ্যুৎকেন্দ্রের অলস বসে থাকার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্মত (ভোল্টেজ ওঠানামা ছাড়া) বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ ভোল্টেজ ব্যবহারকারী ভারী শিল্প গ্রাহকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও বিশেষ শিল্প ট্যারিফ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

জামানতের অর্থ বা সিকিউরিটি মানি হিসেবে সরকারের কাছে যে বিপুল অর্থ জমা থাকে, তার বিপরীতে সুদ দিতে হবে অথবা তা মাসিক বিলের সঙ্গে সমন্বয় করার সুবিধা দিতে হবে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের দফায় দফায় এমন মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতি এবং জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে । একদিকে আইএমএফের শর্ত পূরণ ও সরকারের ভর্তুকির চাপ কমানোর রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা ও শিল্প খাতের টিকে থাকার লড়াই- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।

তবে কেবল দাম বাড়িয়ে লোকসান বা ঘাটতি মেটানোর এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে। শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে সরকারের উচিত হবে বিদ্যুৎ খাতের ভেতরের সংকটগুলোর দিকে নজর দেওয়া।

খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানো, সিস্টেম লস দূর করা এবং গ্রামীণ ও শহরের বিদ্যুৎ বৈষম্য দূরীকরণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিদ্যুৎ বিলের এই বাড়তি বোঝা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও বিপন্ন করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হুমকির মুখে ফেলবে।

/বিবি/