শিরোনাম

দিনে ১০টির বেশি খুন, বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
দিনে ১০টির বেশি খুন, বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা
দেশে খুনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করায় বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যার মামলা হয়েছে।

২০২৫ সালের একই সময়ে ৯৯৩টি হত্যা মামলা হয়েছিল। তবে এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭৬৭। এর আগে ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যা মামলা হয়েছিল ৭৯৪টি।

চলতি বছরের এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকায়।

সবশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে ৫ জন অস্ত্রধারী এসে খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে। পরে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি মৃত্যু রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ঘটেছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের বেশির ভাগই বিএনপির নেতা-কর্মী। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকজন কুখ্যাত গ্যাং লিডার ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়ে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এর ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা পেয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এসব অপরাধী নিজেদের হারানো প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুরোনো বিরোধের জের মেটাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মুক্তি পাওয়া বা দেশে ফিরে আসা শীর্ষ অপরাধীদের মধ্যে অন্যতম ‘কিলার আব্বাস’, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম ওরফে ‘টিটন’, খোরশেদ আলম ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’, মোল্লা মাসুদ ও টোকাই সাগর।

২০০১ সালের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকাভুক্ত হাজারীবাগের ইমন ও মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল নিউ মার্কেট এলাকায় ইমনের ভগ্নিপতি টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবার এ ঘটনার জন্য হেলালকে দায়ী করলেও হেলাল অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে ইমনের সহযোগীরাই জড়িত। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জন গুলিবিদ্ধ হন। এপ্রিল মাসে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত হন। গুলিবিদ্ধ হন ৩৭ জন। মার্চ মাসে ১১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জন আহত হন। এ সময় ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হন।

সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনার বড় অংশে বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত ছিলেন অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে সারা দেশে ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীরা বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার ভয় পেত। বর্তমানে পুলিশ মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে দায়িত্ব পালন করছে।

/এফসি/