শিরোনাম

বিনিময়ের প্লটে ভেঞ্চুরার বহুতল ভবন!


বিনিময়ের প্লটে ভেঞ্চুরার বহুতল ভবন!
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ১১৬ নম্বর রোডের সিইএস (এ)-৮-এর ১১ নম্বর বাড়ির গেট। চারদিক ইস্পাতের বেষ্টনীতে ঘেরা। ভেতরে চলছে বহুতল ভবন নির্মাণের তোড়জোড়। সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে এই দৃশ্য দেখা গেছে।

বেশ কিছুক্ষণ ওই বাড়ির গেটে টোকা দেওয়ার পর ভেতর থেকে একজন শ্রমিক উঁকি দিলেন। পরিচয় দেওয়ার পর এই প্রতিনিধিকে ওই প্লটের ভেতরে ঢোকার সুযোগ দিলেন ওই শ্রমিক। গেটের ডানপাশে কিছু নির্মাণসামগ্রী রাখা। পাশে একটি ছোট্ট ঘর। সেখানে শ্রমিকরা থাকেন। বিশাল জায়গা খালি পড়ে আছে। ওই শ্রমিক জানালেন, ‘এটা ভেঞ্চুরা প্রপার্টিজের প্রজেক্ট। তারা এক বছর ধরে এখানে আছেন।’

স্থানীয়রা জানান, এখানে একসময় একতলা বাড়ি ছিল। ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার পাহারা। কিন্তু পর্দার আড়ালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মাত্র নির্দেশে বদলে যায় এই প্লটের মালিকানা।

রাজধানীর পুরান ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেনে ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন বাড়ি ‘রোজ গার্ডেন’। গত শতকে নির্মিত এই ভবনে আছে আভিজাত্যের ছাপ। এক সময় এটি ছিল বাঙালির রাজনীতির আঁতুড়ঘর।

দীর্ঘদিন স্যুটিংস্পট হিসেবে ব্যবহৃত রোজ গার্ডেন এখন আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা খরচ করে তা কেনা হয়েছে। সেখানে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় গত ডিসেম্বর থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে অনুসন্ধান। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নথিপত্র সংগ্রহের কাজও শেষ। এখন অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের অপেক্ষায় দুদক।

বাড়িটি কিনতে সরকারি ক্রয় আইনসহ প্রচলিত তিনটি আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। কিনতে গিয়ে বাড়িটির মূল্য পরিশোধের পাশাপাশি মালিককে অতিরিক্ত হিসেবে গুলশানের উচ্চ মূল্যের একটি সরকারি জমিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই স্থাপনাটি কিনতে ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে বাড়ির মালিককে পরিশোধ করা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর গুলশানে ২০ কাঠা জমিসহ একতলা ভবনও দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ির মালিককে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করা। তবে শুরু থেকেই এই ক্রয়ের মূল্য নির্ধারণ এবং প্রক্রিয়া নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল।

এর আগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ২০১৮ সালের ৮ আগস্টের বৈঠকে রোজ গার্ডেন কিনে নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রোজ গার্ডেনের তৎকালীন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সম্পত্তির মূল্য ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করে।

দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ওই বাড়িটিকে ‘পুরাকীর্তি’দেখিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা (গুলশানের সরকারি বাড়ির মূল্যসহ) লোকসান দেওয়ার ওই ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, গণপূর্তমন্ত্রী প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বাড়িটি কিনতে অর্থছাড়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং দফায় দফায় দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। কেনার পর বাড়িটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেন প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ।

এ ছাড়া ওই বাড়ি কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব আবুল কাশেম, উপসচিব জিল্লুর রহমান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আক্তার জাহান প্রমুখ।

বাড়ির দাম বাড়িয়ে ১০৫ কোটি থেকে ৩৩২ কোটি টাকা

বাড়িটির দাম নির্ধারণের জন্য অর্থ, ভূমি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। আশপাশের জমির দাম ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে ওই কমিটি বাড়িটির যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে ১০৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। কমিটির প্রতিবেদনের পর রহস্যজনকভাবে মালিকপক্ষের আপত্তির কথা বলে দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে ২১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ধার্য করা হয়।

২০১৮ সালের ২৪ মে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সারসংক্ষেপ পাঠালে সেখান তেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাড়িটি কেনার জন্য ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় রোজ গার্ডেনের মালিককে ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে।

২১০ কোটি টাকা ধার্য করার পর কেন এবং কোন যুক্তিতে ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধের অনুমোদন দেওয়া হলো, সরকারি নথিতে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এমনকি রোজ গার্ডেনের মালিক মৃত কাজী আবদুর রকিবের পরিবার বাস্তবে কত টাকা বুঝে পেয়েছে, তারও কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।

উপহার গুলশানের ২০০ কোটি টাকার প্লট

বিশাল অঙ্কের টাকার পাশাপাশি রোজ গার্ডেনের মালিককে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ আখ্যা দিয়ে গুলশানের ১১৬ নম্বর রোডের সিইএস (এ)-৮-এর ১১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ১ বিঘা (২০ কাঠা) আয়তনের একটি মূল্যবান সরকারি প্লট বিনা মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমান বাজারে গুলশানের ওই প্লটের মূল্য অন্তত ২০০ কোটি টাকা।

নগদ টাকা এবং গুলশানের এই বাড়ির মূল্য মিলিয়ে রাষ্ট্রের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।

সোমবার (২৫ মে) সরেজমিনে বাড়িটির আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, একসময় এই জায়গায় একতলা বাড়ি ছিল। আবাসন প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চুরা প্রপার্টিজ দায়িত্ব নেওয়ার পর এখানে থাকা একতলা ভবন ভেঙে ফেলা হয়।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ৮ জুন ভেঞ্চুরা প্রপার্টিজের গুলশানের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান কাজী রকিবুল করিম দেশের বাইরে আছেন। পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) স্থপতি মো. রাশেদ ইকবালের সাথে দেখা করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগের প্রধান মো. জুলহাস এই প্রতিবেদককে বলেন, এমডি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। এখন কথা বলতে পারবেন না।

গুলশানের ওই প্লটের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. জুলহাস বলেন, ‘জায়গার মালিক দেশের বাইরে থাকেন। চুক্তির পরেই তারা পুনরায় চলে গিয়েছেন। কোথায় থাকেন জানি না।’ ওই প্লটে ভেঞ্চুরার প্রকল্পের কাজের অগ্রগগির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্লটটি আবাসিক এলাকায়। তাই সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট হতে পারে। এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধান

দুদকের সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান টিমের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, নথিপত্র সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে। তবে জমির দলিল যেখানে হয়েছে, সেই সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র এখনো পাওয়া যায়নি। এছাড়া দুদকের কমিশন না থাকায় জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টিও থমকে আছে।

অনুসন্ধানে যুক্ত দুদকের কর্মকতারা জানান, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারেই দেখা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ কমিশন বিবেচনায় নিলে তবেই ওই অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়। রোজ গার্ডেনের বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে দুদকের তৎকালীন কমিশনের নির্দেশে একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরেই এর অনুসন্ধান শুরু হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রোজ গার্ডেনের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক। দুদকের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু রোজ গার্ডেন কেনার সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জড়িত। তাই দুদকের নতুন কমিশন না আসা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

/বিবি/