শিরোনাম

অনলাইন জুয়া: ঋণ, আত্মহত্যা আর ভাঙা সংসারের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
অনলাইন জুয়া: ঋণ, আত্মহত্যা আর ভাঙা সংসারের গল্প

দেশজুড়ে নীরবে বিস্তার করছে এক ভয়ংকর আসক্তি– অনলাইন জুয়া। স্মার্টফোনের ছোট্ট পর্দা আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজ লেনদেনকে হাতিয়ার বানিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল এক বেটিং সিন্ডিকেট। একসময় আড়ালে-আবডালে সীমাবদ্ধ থাকা তাসের আড্ডার জুয়া এখন পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। আর এর নির্মম পরিণতিতে নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য পরিবার, ভাঙছে সংসার, বাড়ছে আত্মহত্যা, চুরি-ছিনতাই ও সামাজিক অপরাধ।

মাত্র একটি স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই এখন যে কেউ ঢুকে পড়তে পারে অনলাইন জুয়ার অন্ধকার জগতে। শুরুতে সামান্য লাভের প্রলোভন দেখিয়ে খেলোয়াড়দের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সর্বস্ব হারিয়ে ঋণ, হতাশা আর অপরাধের জালে আটকে পড়ে মানুষ।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে এক সরকারি চাকরিজীবী এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরিবারের অজান্তে সেই পুরো টাকাই হারিয়ে ফেলেন জুয়ায়। ঋণের চাপ, সংসারের অশান্তি আর মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গত ১০ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেন তিনি।

কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়ার বাসিন্দা ইমরান (২৮) অনলাইন বেটিংয়ে ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়েন। একসময় ঋণের বোঝা এতটাই বেড়ে যায় যে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা জানান, মোবাইল ফোনে সারারাত বেটিং করতেন ইমরান। শেষ দিকে পাওনাদারদের চাপ ও মানসিক অস্থিরতায় তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।

বরিশালেরর মুলাদী থানার বোয়ালিয়া গ্রামের বাবু নামের এক মুরগির খামারি অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। জুয়ার ক্ষতির জের টানতে প্রথমে খামার বিক্রি করেন তিনি। এরপর কিছু জমিও বিক্রি করে অনেকটাই নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একটা সময় মানিসক চাপ সামলাতে না পেরে বছর তিনেক আগে আত্মহত্যা করেন বাবু।

শুধু আত্মহত্যাই নয়, অনলাইন জুয়া তৈরি করছে সহিংসতার ঘটনাও। শ্রীমঙ্গলের কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া ২২ হাজার টাকা জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন। টাকা ফেরত চাইতে গেলে বিরোধের একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ বন্ধুরাই তাকে হত্যা করে।

বগুড়া ও যশোরেও অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে একাধিক আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা ও দাম্পত্য কলহের ঘটনা ঘটেছে। অনেক পরিবারে স্বামী গোপনে জুয়ায় টাকা হারিয়ে সংসারের খরচ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কোথাও স্ত্রীর গয়না বিক্রি হচ্ছে, কোথাও পরিবারের সঞ্চয় উধাও হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি।

কক্সবাজারের এক গৃহবধূ জানান, তার স্বামী অনলাইন জুয়ার নেশায় ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়েছেন। একপর্যায়ে সন্তানদের স্কুলের বেতন পর্যন্ত দিতে পারেননি। প্রতিবাদ করলেই ঘরে শুরু হতো ঝগড়া-বিবাদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ চুরি, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ পরিবারের টাকা চুরি করছে, কেউ স্বর্ণালংকার বিক্রি করছে, আবার কেউ মোবাইল ফোন ছিনতাই কিংবা মাদক ব্যবসার পথেও হাঁটছে।

মেহেরপুর ও কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজন অনলাইন জুয়ার এজেন্ট আটক হলেও মূল হোতারা বেশির ভাগ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ অ্যাপ ও সার্ভার বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া সেলিব্রেটি ভিডিও ব্যবহার করে নতুন খেলোয়াড় টানছে চক্রগুলো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি এখন মোবাইল ব্যাংকিং। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে সহজে টাকা লেনদেনের সুযোগ থাকায় অল্প বয়সীরাও দ্রুত এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু একটি অপরাধ নয়; ধীরে ধীরে সামাজিক মহামারিতে রূপ নিচ্ছে অনলাইন জুয়া। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর ভয়াবহতা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

/আরএ/এফসি/