কেবল একমুঠো ভাতের আকুতি

কেবল একমুঠো ভাতের আকুতি
সিজেডএন ডেস্ক

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবানের দুর্গম জনপদগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক সংকট। ঘরবাড়ি ছেড়ে পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বহু পরিবার এখন খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আর্তি—‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু শিশুদের জন্য অন্তত একমুঠো ভাত চাই।’
বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার বন্যার পানি বাড়তে থাকায় পাশের একটি পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। টানা তিন দিন ধরে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। ঘরে রেখে আসা চাল, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তাদের ভাষ্য, তেমন কোনো চাহিদা নেই—শুধু শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো সামান্য চাল বা রান্না করা ভাত পেলেই চলবে।
শুধু লেমুঝিড়ি নয়, বান্দরবানের আরও অনেক দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের সহায়তা পৌঁছালেও পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষের কাছে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল কোমর থেকে কোথাও কোথাও গলা সমান পানিতে ডুবে আছে। ফলে হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা পাশের পাহাড় ও বনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমা বলেন, তিন দিন ধরে তারা পানিবন্দি। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারেননি। কেউ অন্যের বাড়িতে, আবার কেউ সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের বনে রাত কাটাচ্ছেন। হাতে থাকা শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা পৌঁছেনি।
এদিকে জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে নৌকায় মানুষ পারাপার করছে। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করছেন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য স্বাভাবিক সময়ের ১০ টাকার ভাড়া এখন গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম বলেন, আগে শহরে যেতে ১০ টাকা লাগলেও এখন অর্ধেক পথ যেতে ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। কয়েক দিনের দুর্ভোগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আরেক বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, নৌকা বা ভ্যানের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোমরসমান পানি মাড়িয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে।
উমং প্রু মারমা জানান, অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে সড়কে জমে থাকা পানির কারণে অনেক বেশি সময় ও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। তার মতে, এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে প্রতি বছরের এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত পর্যন্ত শুধু সদর উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় চার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে সাঙ্গু নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিসার ইনচার্জ কুমার মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে। আর ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন জানান, বন্যাকবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরাও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় খোলা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবানের দুর্গম জনপদগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক সংকট। ঘরবাড়ি ছেড়ে পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বহু পরিবার এখন খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আর্তি—‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু শিশুদের জন্য অন্তত একমুঠো ভাত চাই।’
বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার বন্যার পানি বাড়তে থাকায় পাশের একটি পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। টানা তিন দিন ধরে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। ঘরে রেখে আসা চাল, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তাদের ভাষ্য, তেমন কোনো চাহিদা নেই—শুধু শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো সামান্য চাল বা রান্না করা ভাত পেলেই চলবে।
শুধু লেমুঝিড়ি নয়, বান্দরবানের আরও অনেক দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের সহায়তা পৌঁছালেও পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষের কাছে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল কোমর থেকে কোথাও কোথাও গলা সমান পানিতে ডুবে আছে। ফলে হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা পাশের পাহাড় ও বনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমা বলেন, তিন দিন ধরে তারা পানিবন্দি। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারেননি। কেউ অন্যের বাড়িতে, আবার কেউ সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের বনে রাত কাটাচ্ছেন। হাতে থাকা শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা পৌঁছেনি।
এদিকে জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে নৌকায় মানুষ পারাপার করছে। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করছেন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য স্বাভাবিক সময়ের ১০ টাকার ভাড়া এখন গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম বলেন, আগে শহরে যেতে ১০ টাকা লাগলেও এখন অর্ধেক পথ যেতে ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। কয়েক দিনের দুর্ভোগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আরেক বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, নৌকা বা ভ্যানের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোমরসমান পানি মাড়িয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে।
উমং প্রু মারমা জানান, অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে সড়কে জমে থাকা পানির কারণে অনেক বেশি সময় ও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। তার মতে, এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে প্রতি বছরের এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত পর্যন্ত শুধু সদর উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় চার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে সাঙ্গু নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিসার ইনচার্জ কুমার মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে। আর ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন জানান, বন্যাকবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরাও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় খোলা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কেবল একমুঠো ভাতের আকুতি
সিজেডএন ডেস্ক

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবানের দুর্গম জনপদগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক সংকট। ঘরবাড়ি ছেড়ে পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বহু পরিবার এখন খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আর্তি—‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু শিশুদের জন্য অন্তত একমুঠো ভাত চাই।’
বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার বন্যার পানি বাড়তে থাকায় পাশের একটি পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। টানা তিন দিন ধরে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। ঘরে রেখে আসা চাল, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তাদের ভাষ্য, তেমন কোনো চাহিদা নেই—শুধু শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো সামান্য চাল বা রান্না করা ভাত পেলেই চলবে।
শুধু লেমুঝিড়ি নয়, বান্দরবানের আরও অনেক দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের সহায়তা পৌঁছালেও পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া অনেক মানুষের কাছে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল কোমর থেকে কোথাও কোথাও গলা সমান পানিতে ডুবে আছে। ফলে হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা পাশের পাহাড় ও বনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমা বলেন, তিন দিন ধরে তারা পানিবন্দি। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারেননি। কেউ অন্যের বাড়িতে, আবার কেউ সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ের বনে রাত কাটাচ্ছেন। হাতে থাকা শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা পৌঁছেনি।
এদিকে জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে নৌকায় মানুষ পারাপার করছে। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করছেন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের জন্য স্বাভাবিক সময়ের ১০ টাকার ভাড়া এখন গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম বলেন, আগে শহরে যেতে ১০ টাকা লাগলেও এখন অর্ধেক পথ যেতে ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। কয়েক দিনের দুর্ভোগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আরেক বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, নৌকা বা ভ্যানের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোমরসমান পানি মাড়িয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে।
উমং প্রু মারমা জানান, অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে সড়কে জমে থাকা পানির কারণে অনেক বেশি সময় ও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। তার মতে, এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে প্রতি বছরের এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত পর্যন্ত শুধু সদর উপজেলার ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রায় চার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একইভাবে সাঙ্গু নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিসার ইনচার্জ কুমার মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে। আর ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাই সকাল পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা আফরিন জানান, বন্যাকবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরাও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় খোলা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




