শিরোনাম

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম: প্লাবিত ৫ জেলা, ৩ দিনে ২২ জনের মৃত্যু

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম: প্লাবিত ৫ জেলা, ৩ দিনে ২২ জনের মৃত্যু
ক্সকক্সবাজারের উখিয়ায় একটি মাদ্রাসার দেয়াল চাপা পড়ে তিন ছাত্রীর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালায় প্রশাসন ও স্থানীয়রা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ধস, দেয়ালধস, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে গত তিন দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ, ব্যাহত হয়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে এটি প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এরই প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা লঘুচাপ সৃষ্টি হলে এ ধরনের ভারী বর্ষণ অস্বাভাবিক নয়। তবে আষাঢ়ের প্রথম ভাগে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কয়েক দিনের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় প্রাণহানি

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধস এবং দেয়ালচাপার ঘটনায় তিন দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গতকালই প্রাণ হারিয়েছে সাত শিশু।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। দুপুরের দিকে ভারী বর্ষণের সময় একটি মহিলা হেফজখানার পাশে পাহাড়ঘেঁষা দেয়াল ধসে মাদ্রাসার ওপর পড়ে। এতে পাঁচ শিক্ষার্থী নিহত হয় এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়। আহতদের কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার সময় মাদ্রাসাটিতে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। সন্ধ্যার দিকে উদ্ধারকাজ শেষ হয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে মোট ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আহত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরের পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় ১০ মাস বয়সী এক শিশুসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং তার মা আহত হন। অন্যদিকে চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী।

রেললাইন পানিতে ডুবে থাকায় আটকা পড়ে ঢাকা ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন
রেললাইন পানিতে ডুবে থাকায় আটকা পড়ে ঢাকা ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন

দ্বিতীয় দিনের মতো জলমগ্ন চট্টগ্রাম নগর

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীতে দ্বিতীয় দিনের মতো তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ, আগ্রাবাদ, রেয়াজউদ্দিন বাজার, চান্দগাঁও, হালিশহর, আকবরশাহ, খাজা রোড, রামপুরাসহ অসংখ্য এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। কোথাও কোথাও আট থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি স্থায়ী হয়।

জলাবদ্ধতার কারণে নিচতলার ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবারকে পানির মধ্যেই দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হননি। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ

অতিরিক্ত বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রেললাইন দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী।

রেল প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রেললাইন পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনার কথা জানান।

এর আগে ২০২৩ সালে বন্যার পানিতে কক্সবাজার রেলপথের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে পানি নিষ্কাশনের জন্য অতিরিক্ত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও এবারও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।

সাজেকে আটকা প্রায় সাড়ে চারশ পর্যটক

অবিরাম বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকে অবস্থানরত প্রায় ৪৫০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। প্রশাসন আগেই পর্যটকদের নতুন করে সাজেকে না যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে যাঁদের ফেরার কথা ছিল, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাঁরা ফিরতে পারেননি।

এদিকে মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় শুক্রবার পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।

চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের সাপছড়ি ইউনিয়নের দেপ্পোছড়িমুখ এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ে। এ সময় সড়কে সাময়িকভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়
চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের সাপছড়ি ইউনিয়নের দেপ্পোছড়িমুখ এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ে। এ সময় সড়কে সাময়িকভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়

পাঁচ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা পানির নিচে চলে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, রাউজান, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে গেছে, আবার অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পানিবন্দী মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।

সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় সাঙ্গু, ডলু ও টঙ্কাবতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজারে পানিবন্দী ১৫ হাজার পরিবার

চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোমরসমান পানিতে ডুবে গেছে অনেক বাড়ির উঠান। বীজতলা, সবজিখেত এবং কৃষিজমিরও ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবানেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টানা বর্ষণে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদম, থানচি ও রোয়াংছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলা শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

রুমা-বগালেক-কেওক্রাডং সড়কের একটি অংশে পাহাড়ধসের কারণে কেওক্রাডংমুখী যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।

দীঘিনালা–সাজেক সড়কের কবাখালি এলাকায় পানি ওঠায় নৌকা নিয়ে পারাপার করছে অনেকে
দীঘিনালা–সাজেক সড়কের কবাখালি এলাকায় পানি ওঠায় নৌকা নিয়ে পারাপার করছে অনেকে

খাগড়াছড়িতে সড়ক তলিয়ে যান চলাচল বন্ধ

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি, দীঘিনালা ও লংগদু-সাজেক সড়কের একাধিক অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রশাসনের সতর্কতা

প্রশাসন জানিয়েছে, ভারী বর্ষণ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাই পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা, নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

/এমআর/