শিরোনাম

ঘরে জ্বলছে না চুলা, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ঘরে জ্বলছে না চুলা, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো গাড়িতে গ্যাস দিতে পারছে না ফিলিং স্টেশনগুলো

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসাবাড়ির বাসিন্দা ও সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকেরা। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না শেষ করতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েক গুণ বেশি লাগছে। আবার কোথাও দিনের বড় একটি সময় গ্যাস মিলছে না, ফলে বন্ধ থাকছে রান্নার চুলা। একই কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক পাচ্ছেন সামান্য পরিমাণ গ্যাস।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে মিরপুরের আমতলা এলাকার টিনের ছাউনির একটি ঘরে রান্না করছিলেন শিরিন বেগম। সকাল এগারোটার দিকে তিনি রান্না শুরু করেন। দেড় ঘণ্টা পার হলেও তখনো একটি পদ রান্না শেষ হয়নি। এক চুলায় ছোট মাছের ভুনা, অন্যটিতে পানি গরম করছিলেন তিনি। পানি গরম হওয়ার পর তাতে চাল দিয়ে ভাত বসানোর কথা।

শিরিন জানান, গ্যাসের চাপ এত কম যে সরাসরি পানি ও চাল দিয়ে ভাত রান্না করা যায় না। আগে পানি গরম করে নিতে হয়। এরপর চাল দিয়ে কোনোভাবে রান্না করতে হয়। মাছের তরকারি রান্না শেষ হওয়ার পরও ভাত হতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।

বিরক্তি প্রকাশ করে শিরিন বলেন, ‘একবার রানতেই দিন পার।’

শিরিনের আগে একই চুলায় রান্না করেছেন রেশমা বেগম। মাছ ভুনা, কচুমুখি-চিংড়ি ও ভাতের পাশাপাশি রাতের রান্নাও সেরে নিয়েছেন তিনি। সকাল আটটায় রান্না শুরু করে শেষ করতে তার সময় লেগেছে প্রায় তিন ঘণ্টা।

রেশমা বলেন, তিনি ও শিরিন গৃহিণী। অন্য ছয় পরিবারের মধ্যে তিন পরিবারের নারীরা তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। একজন বাসাবাড়িতে কাজ করেন এবং আরেকজন স্বামীর সঙ্গে দোকানে কাজ করেন। গ্যাসের সংকটে বাইরে কর্মরত নারীরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

রেশমার ভাষায়, ‘আমরা তো ঘরে থাকি, আস্তেধীরে রানদি। কামে যাওয়া মাইয়াগো কষ্ট বেশি। ভোর চাইরটা থেকে উইঠা রানদা লাগে। অনেক সময় চুলাই জ্বলে না, গ্যাস কম থাহে, ভাত-তরকারি পাকে না।’

রান্নার সময় বদলে গেছে

শুধু আমতলা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় দিনের বড় অংশ গ্যাস সরবরাহ থাকছে না।

মিরপুরের সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফাহিমা আক্তার জানান, গ্যাসের সংকটে তাঁর পরিবারের রান্নার সময় পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে দুপুর ১২টার দিকে রান্না শুরু করলে বেলা একটা থেকে দেড়টার মধ্যেই তা শেষ হয়ে যেত। এখন আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ গ্যাসও পাওয়া যায় না। দুটি চুলা একসঙ্গে জ্বালানো সম্ভব হয় না। একটি চুলা বন্ধ রাখলে অন্যটিতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যায়।

এ কারণে সকালের নাশতা শেষ করেই সকাল ১০টার দিকে দুপুর ও রাতের রান্না শুরু করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গ্যাস সংকটের কারণে পরিবারের সকালের খাবারের অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। ফাহিমা বলেন, ‘সকালে ছেলের বাবা পান্তা খায়। তাই অফিসে যাওয়ার আগে স্বামীর নাশতা নিয়ে ঝামেলা হয় না। গ্যাসের সমস্যা হওয়ার পর থেকে ছেলেও এখন বাবার সঙ্গে পান্তা খাওয়া শুরু করছে।’

সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

বাসাবাড়ির পাশাপাশি গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে কয়েক মিনিট সময় লাগছে। এতে স্টেশনের ভেতর ও বাইরে দীর্ঘ যানজটের মতো সারি তৈরি হচ্ছে।

মিরপুর সিরামিকস রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভারশন সেন্টারের ডিসপেনসার অপারেটর মোহাম্মদ আকাশ বলেন, বৃহস্পতিবার গ্যাসের চাপ গত কয়েক দিনের তুলনায় আরও কম ছিল। গত কয়েক দিন চাপ ৮০ থেকে ৯০-এর মধ্যে থাকলেও এদিন সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে ৭০।

তিনি জানান, এই চাপের মধ্যে ৬০ কেজির একটি সিলিন্ডারে ১৮০ থেকে ২০০ টাকার গ্যাস ভরতে তিন থেকে চার মিনিট সময় লাগছে। প্রতিটি ডিসপেনসারিতে দুটি সংযোগ থাকলেও একসঙ্গে দুটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, দুটি গাড়িতে একসঙ্গে গ্যাস সরবরাহ করলে চাপ আরও কমে যায়। তখন একটি গাড়িতে ৮০ থেকে ১০০ টাকার বেশি গ্যাস ঢোকে না।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালকদের ফিরতে হচ্ছে সামান্য গ্যাস নিয়ে। ওই স্টেশনে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক খোরশেদ আলম। গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পান বেলা ১১টার কয়েক মিনিট পর। অর্থাৎ প্রায় দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। এতক্ষণ অপেক্ষার পর তাঁর গাড়িতে গ্যাস ঢুকেছে মাত্র ১৭৮ টাকার।

খোরশেদ বলেন, ‘প্রেশার বেশি থাকলে এই টাকার গ্যাস দিয়ে এসি চালিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গাড়ি চলত। এসি বন্ধ রাখলে ৩৮-৪০ কিলোমিটারও চলত। কিন্তু প্রেশার কম থাকলে গ্যাসের সঙ্গে হাওয়া ঢুকে যায়। তখন ৩০ কিলোমিটারও হয়তো চলবে না।’

যাত্রীবাহী বাসের চালক মামুন মিয়ার ভোগান্তিও একই রকম। মিরপুর সুপার লিংকের এই চালক জানান, তাঁর বাসে সাধারণত ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকার গ্যাস নেওয়া যায়। কয়েক দিন আগেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু বৃহস্পতিবার তাঁর বাসে গ্যাস ঢুকেছে মাত্র ২৬০ টাকার।

মামুন বলেন, ‘এই গ্যাস দিয়ে কোনোমতে একবার মিরপুর থেকে আজিমপুর যাওয়া-আসা করা যাবে, তা-ও রাস্তায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার রিস্ক আছে। এখন এই গ্যাস নিয়া কী করুম!’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকার গ্যাস বন্ধ করলে একেবারে বন্ধ করে দিক। এই যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। অল্প অল্প গ্যাস নিয়া কিছুই হয় না। না চালানো যায় গাড়ি, না হয় রোজগার, না থাকে মালিকের পয়সা।’

মামুন জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে ট্রিপ শুরু করে একবার মিরপুর থেকে আজিমপুর এবং পরে আজিমপুর থেকে মিরপুরে ফিরেছেন তিনি।

কোথাও স্টেশন বন্ধ, কোথাও দীর্ঘ সারি

গ্যাসের চাপ না থাকায় মিরপুরের মিনারভা সিএনজি স্টেশন ও শাহজালাল সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। শাহজালাল সিএনজি স্টেশনের কর্মী রফিকুল ইসলাম জানান, রাত একটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ ছিল। ওই সময় যানবাহনে গ্যাস দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে স্টেশনের লাইনে আর গ্যাস পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে আরিয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সেখানে গ্যাস নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৩৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ৪৩টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশার সারি স্টেশনের সামনের সড়ক পেরিয়ে বিপরীত পাশেও ছড়িয়ে পড়ে।

গ্যাসের এই সংকটে একদিকে যেমন বাসাবাড়িতে রান্নার সময় বেড়ে গেছে, অন্যদিকে সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আয়-রোজগারেও প্রভাব পড়ছে। এর সঙ্গে দিনের বিভিন্ন সময় ও রাতের লোডশেডিং যুক্ত হয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

/এমআর/