শিরোনাম

ছাত্রনেতা থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি

ছাত্রনেতা থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। সেখান থেকে সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে ভোট শেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির এই নেতা। ভোট গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫টি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

পরে সন্ধ্যায় মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। ফলে ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যে রাজনৈতিক পথচলার শুরু, তার নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে বঙ্গভবনে।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি এরশাদ সরকারের সময়ে তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মির্জা ফখরুল উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন ঢাকা কলেজ থেকে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

তবে স্বাধীনতার পর রাজনীতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি তিনি। বরং যোগ দেন সরকারি চাকরিতে।

শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শুরু হয় তার কর্মজীবন। পরে আরও কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিবের দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এস এ বারী পদত্যাগ করা পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

এরপর আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু ওই বছরই তার জীবনের গতিপথ বদলে যায়। শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন মির্জা ফখরুল।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে

১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় স্থানীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই সময় বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।

১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। এরপর জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা শুরু করেন।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। অপেক্ষা করতে হয় আরও পাঁচ বছর।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান।

২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বিএনপির মহাসচিব

এরপর মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।

২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। পাঁচ বছর পর, ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

এরপর প্রায় এক দশক ধরে দলটির কেন্দ্রীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। এ সময় বিএনপির রাজনীতিতে নানা সংকট এসেছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান, মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়ে দলের নেতৃত্বের বড় একটি অংশ সামলাতে হয়েছে তাকে।

রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি ও বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়েছে তাকে।

এবার বঙ্গভবনের পথে

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও সংসদে ফেরেন মির্জা ফখরুল। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিএনপি তাকে প্রার্থী করে। শেষ পর্যন্ত সংসদে সরাসরি ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি।

নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ধারা ১১ অনুসারে নির্বাচনি কর্তা ও নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১-এর বিধি ১২(৬) অনুযায়ী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে তার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন মির্জা ফখরুল।

রাজনীতির বাইরে পরিবার

রাজনীতির ব্যস্ততার বাইরে মির্জা ফখরুলের পারিবারিক জীবনও আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন সময়ে। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার।

বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী, এরপর একটি বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব, মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের পথটি ছিল নানা বাঁকে ভরা।

/এমআর/