মনিপুর স্কুলে ১৬ বছরে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম

মনিপুর স্কুলে ১৬ বছরে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম
রুবেল আবিদ

রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত ১৬ বছরে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, কর ও ভ্যাট ফাঁকি ও জবাবদিহিহীন ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।
তদন্তে আয়-ব্যয়, নির্মাণকাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, ভ্যাট-আয়কর, প্রিন্টিং, ম্যাগাজিন ফি, যানবাহন ক্রয়, ক্যান্টিন ভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার খাত পর্যালোচনা করা হয়। সাত সদস্যের তদন্ত দল প্রতিবেদনটি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ধরা পড়ে নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে। গত ১৬ বছরে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজে ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর কোনো ভাউচার, অনুমোদনপত্র বা হিসাব পাওয়া যায়নি। ইব্রাহিমপুর, শেওড়াপাড়া, রূপনগর ও মূল শাখাগুলোতে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি, নকশা অনুমোদন, সয়েল টেস্ট রিপোর্ট, রাজউকের অনুমোদন কিংবা কার্যাদেশ দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করেন, আগের প্রশাসন অনেক নথি সরিয়ে ফেলেছে; তবে তদন্ত কমিটি এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল থেকে বিধি অনুযায়ী ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে বিশেষ ক্লাস বাবদ শিক্ষকদের দেওয়া ১৩ কোটি টাকার সম্মানীর ওপর আয়কর কাটা হয়নি, ফলে আরও প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকার কর ফাঁকি হয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের বিপরীতেও ভ্যাট ও আয়কর বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত প্রতিবেদনে বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা বাবদ ৬৩ কোটি এবং নগর ভাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা হয়। তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, এই অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে হবে।
নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ও সিলেবাস মুদ্রণের নামে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে এসব ব্যয়ের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি পুরো ব্যয়কেই আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিধিবহির্ভূতভাবে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী নেওয়ার নিয়ম নেই। এ খাতেও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন খাতে ৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হলেও তার কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। একইভাবে ৭টি গাড়ি কেনার কথা বলা হলেও ৬টির কোনো কাগজপত্র নেই। গাড়ি কেনায় মোট ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবও অস্পষ্ট।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০১৩ সালের পর প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ হয়নি। কিন্তু প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১৫০ টাকা করে ম্যাগাজিন ফি আদায় অব্যাহত ছিল। গত ১২ বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এভাবে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত কমিটির মতে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।
ইব্রাহিমপুর শাখায় চার মাসে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন শাখার ক্যান্টিন ও দোকান ভাড়া বাবদ ১১ বছরে আদায় করা ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকারও কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ডিআইএর তদন্তে ক্যাশবুকে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্যও উঠে এসেছে। বহু বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব লেখা হয়নি, ভাউচার নম্বর ও রশিদ অনুপস্থিত, কিছু হিসাব পেন্সিলে লেখা এবং একই হিসাব একাধিকবার এন্ট্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনেক পৃষ্ঠা ফাঁকা রাখা হয়েছে। তদন্ত দল মনে করছে, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতেই এসব করা হয়েছে।
স্টক রেজিস্টার, চেক ডিমান্ড রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিও উপস্থাপন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে আসবাবপত্র, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল সত্যিই কেনা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন হয়নি এবং গত ১৫ বছরে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাও করা হয়নি, যদিও প্রতি তিন মাসে হিসাব নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া বাতিল কমিটির মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। টেন্ডার ছাড়াই নগদে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার মালামাল কেনা এবং স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মনিপুর স্কুলের নানা বিষয় খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত ১৬ বছরে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, কর ও ভ্যাট ফাঁকি ও জবাবদিহিহীন ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।
তদন্তে আয়-ব্যয়, নির্মাণকাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, ভ্যাট-আয়কর, প্রিন্টিং, ম্যাগাজিন ফি, যানবাহন ক্রয়, ক্যান্টিন ভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার খাত পর্যালোচনা করা হয়। সাত সদস্যের তদন্ত দল প্রতিবেদনটি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ধরা পড়ে নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে। গত ১৬ বছরে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজে ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর কোনো ভাউচার, অনুমোদনপত্র বা হিসাব পাওয়া যায়নি। ইব্রাহিমপুর, শেওড়াপাড়া, রূপনগর ও মূল শাখাগুলোতে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি, নকশা অনুমোদন, সয়েল টেস্ট রিপোর্ট, রাজউকের অনুমোদন কিংবা কার্যাদেশ দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করেন, আগের প্রশাসন অনেক নথি সরিয়ে ফেলেছে; তবে তদন্ত কমিটি এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল থেকে বিধি অনুযায়ী ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে বিশেষ ক্লাস বাবদ শিক্ষকদের দেওয়া ১৩ কোটি টাকার সম্মানীর ওপর আয়কর কাটা হয়নি, ফলে আরও প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকার কর ফাঁকি হয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের বিপরীতেও ভ্যাট ও আয়কর বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত প্রতিবেদনে বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা বাবদ ৬৩ কোটি এবং নগর ভাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা হয়। তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, এই অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে হবে।
নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ও সিলেবাস মুদ্রণের নামে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে এসব ব্যয়ের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি পুরো ব্যয়কেই আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিধিবহির্ভূতভাবে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী নেওয়ার নিয়ম নেই। এ খাতেও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন খাতে ৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হলেও তার কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। একইভাবে ৭টি গাড়ি কেনার কথা বলা হলেও ৬টির কোনো কাগজপত্র নেই। গাড়ি কেনায় মোট ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবও অস্পষ্ট।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০১৩ সালের পর প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ হয়নি। কিন্তু প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১৫০ টাকা করে ম্যাগাজিন ফি আদায় অব্যাহত ছিল। গত ১২ বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এভাবে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত কমিটির মতে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।
ইব্রাহিমপুর শাখায় চার মাসে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন শাখার ক্যান্টিন ও দোকান ভাড়া বাবদ ১১ বছরে আদায় করা ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকারও কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ডিআইএর তদন্তে ক্যাশবুকে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্যও উঠে এসেছে। বহু বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব লেখা হয়নি, ভাউচার নম্বর ও রশিদ অনুপস্থিত, কিছু হিসাব পেন্সিলে লেখা এবং একই হিসাব একাধিকবার এন্ট্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনেক পৃষ্ঠা ফাঁকা রাখা হয়েছে। তদন্ত দল মনে করছে, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতেই এসব করা হয়েছে।
স্টক রেজিস্টার, চেক ডিমান্ড রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিও উপস্থাপন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে আসবাবপত্র, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল সত্যিই কেনা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন হয়নি এবং গত ১৫ বছরে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাও করা হয়নি, যদিও প্রতি তিন মাসে হিসাব নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া বাতিল কমিটির মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। টেন্ডার ছাড়াই নগদে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার মালামাল কেনা এবং স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মনিপুর স্কুলের নানা বিষয় খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

মনিপুর স্কুলে ১৬ বছরে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম
রুবেল আবিদ

রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত ১৬ বছরে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, কর ও ভ্যাট ফাঁকি ও জবাবদিহিহীন ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০১০ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।
তদন্তে আয়-ব্যয়, নির্মাণকাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, ভ্যাট-আয়কর, প্রিন্টিং, ম্যাগাজিন ফি, যানবাহন ক্রয়, ক্যান্টিন ভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার খাত পর্যালোচনা করা হয়। সাত সদস্যের তদন্ত দল প্রতিবেদনটি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ধরা পড়ে নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে। গত ১৬ বছরে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজে ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর কোনো ভাউচার, অনুমোদনপত্র বা হিসাব পাওয়া যায়নি। ইব্রাহিমপুর, শেওড়াপাড়া, রূপনগর ও মূল শাখাগুলোতে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি, নকশা অনুমোদন, সয়েল টেস্ট রিপোর্ট, রাজউকের অনুমোদন কিংবা কার্যাদেশ দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করেন, আগের প্রশাসন অনেক নথি সরিয়ে ফেলেছে; তবে তদন্ত কমিটি এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল থেকে বিধি অনুযায়ী ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে বিশেষ ক্লাস বাবদ শিক্ষকদের দেওয়া ১৩ কোটি টাকার সম্মানীর ওপর আয়কর কাটা হয়নি, ফলে আরও প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকার কর ফাঁকি হয়েছে। অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের বিপরীতেও ভ্যাট ও আয়কর বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত প্রতিবেদনে বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা বাবদ ৬৩ কোটি এবং নগর ভাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা হয়। তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে, এই অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে হবে।
নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ও সিলেবাস মুদ্রণের নামে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে এসব ব্যয়ের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি পুরো ব্যয়কেই আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ ছাড়া পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিধিবহির্ভূতভাবে ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সম্মানী দেওয়া হয়েছে, যদিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্যদের সম্মানী নেওয়ার নিয়ম নেই। এ খাতেও আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন খাতে ৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হলেও তার কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। একইভাবে ৭টি গাড়ি কেনার কথা বলা হলেও ৬টির কোনো কাগজপত্র নেই। গাড়ি কেনায় মোট ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবও অস্পষ্ট।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০১৩ সালের পর প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ হয়নি। কিন্তু প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১৫০ টাকা করে ম্যাগাজিন ফি আদায় অব্যাহত ছিল। গত ১২ বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এভাবে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত কমিটির মতে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।
ইব্রাহিমপুর শাখায় চার মাসে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন শাখার ক্যান্টিন ও দোকান ভাড়া বাবদ ১১ বছরে আদায় করা ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকারও কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ডিআইএর তদন্তে ক্যাশবুকে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্যও উঠে এসেছে। বহু বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব লেখা হয়নি, ভাউচার নম্বর ও রশিদ অনুপস্থিত, কিছু হিসাব পেন্সিলে লেখা এবং একই হিসাব একাধিকবার এন্ট্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনেক পৃষ্ঠা ফাঁকা রাখা হয়েছে। তদন্ত দল মনে করছে, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতেই এসব করা হয়েছে।
স্টক রেজিস্টার, চেক ডিমান্ড রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিও উপস্থাপন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে আসবাবপত্র, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল সত্যিই কেনা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন হয়নি এবং গত ১৫ বছরে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাও করা হয়নি, যদিও প্রতি তিন মাসে হিসাব নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া বাতিল কমিটির মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। টেন্ডার ছাড়াই নগদে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার মালামাল কেনা এবং স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মনিপুর স্কুলের নানা বিষয় খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেউ দুর্নীতি করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা’
মনিপুর স্কুলে ৬৬২ শিক্ষক অবৈধ


