শিরোনাম

শত বছর পেরিয়েও সচল পুরান ঢাকার দুই কুয়া

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শত বছর পেরিয়েও সচল পুরান ঢাকার দুই কুয়া
ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পুরান ঢাকার অলিগলি পেরিয়ে ফরাশগঞ্জের মোহিনী মোহন দাস লেনে ঢুকলেই চোখে পড়ে পুরোনো দিনের স্থাপত্যের ছাপ। শ্যাওলা ধরা দেয়াল, জীর্ণ চৌকাঠ আর সময়ের ভারে নুয়ে পড়া ভবনগুলো যেন এখনও আগলে রেখেছে হারিয়ে যেতে বসা এক শহরের গল্প।

৮ নম্বর রোডের ‘মঙ্গলাবাস’ নামের পুরোনো বাড়িতে ঢুকলে সেই গল্প আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বাড়িটির ভেতরে রয়েছে শতবর্ষী দুটি কুয়া। চারপাশে আধুনিক নগরজীবনের ছাপ থাকলেও কুয়া দুটির কাছে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ এক শতাব্দী পেছনে ফিরে গেছে। মূল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে উঠোনের ডান পাশে প্রথম কুয়াটি। কুয়ার পাশে বসে থালা-বাসন পরিষ্কার করছিলেন শিলা রানী। প্রতিদিনের সংসার চলে এই কুয়ার পানিকে ঘিরেই।

শিলা রানী বলেন, আমরা আমাদের যাবতীয় ‍সব কাজ এই কুয়ার পানিই দিয়ে করি। কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, গোসল-সবই এই কুয়ার পানি দিয়েই চলে। শুধু খাওয়ার পানি নলকূপ থেকে নেই।

বর্ষা এলে কুয়ার চেহারাই বদলে যায়। বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে কুয়া। বাড়ির নারীরা তখন এর ধারে বসে গল্প করেন, কেউ পানি তোলেন, কেউ করেন গৃহস্থালির কাজ। তবে শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে চৈত্রের দিকে, পানির স্তর অনেকটা নিচে নেমে যায়।

বাড়িটির ভেতরের আরেক অংশে রয়েছে পুরোনো একটি মন্দির। তার পাশে রয়েছে দ্বিতীয় কুয়াটি। প্রথমটির তুলনায় এটি আকারে বড়। মোটা দেয়ালের গায়ে জমে আছে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা সময়ের চিহ্ন।

এই কুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভাবনের নিচতলার বাসিন্দা স্বপ্না রানী সাহা। তিনি বলেন, এই কুয়াটা অনেক পুরোনো। শুনেছি প্রায় শতবছর ধরেই এখানে আছে। এত বছর পরও কুয়াটা সচল আছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগে। আমরা এখনও নিয়মিত কুয়া থেকে পানি তুলি এবং প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করি। আগে পানির মান অনেক ভালো ছিল, এখন আগের মতো স্বচ্ছ নেই।

সময় বদলেছে। বাড়ির বাসিন্দা কমেছে, বদলেছে পানির উৎসও। কিন্তু কুয়া দুটো এখনও টিকে আছে।

ছবি: ‍সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ছবি: ‍সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরান ঢাকার এই অঞ্চল একসময় বুড়িগঙ্গার খুব কাছাকাছি ছিল। ফলে আশপাশের অনেক বাড়িতেই কুয়া ছিল। নগরায়ণ, ভবন নির্মাণ ও আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে সেসব কুয়ার মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

তারা জানান, কুয়াটি নির্মাণ করেছিলেন যতীন্দ্রমোহন নামের এক জমিদার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় তিনি কলকাতায় চলে গেলে কুয়াটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পর মঙ্গলাবাসের একাংশ কলেজের ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। অন্য অংশে বসতি গড়ে ওঠে কয়েকটি পরিবারের। এরপর থেকেই এসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কুয়াটি ব্যবহার করে আসছে।

সময়ের সঙ্গে ঢাকা শহরে ওয়াসার পাইপলাইনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০-এর পর আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় বাড়িতে বাড়িতে কুয়ার প্রয়োজন কমতে থাকে।

শাঁখারীবাজার, ফরাশগঞ্জ, গোলনগর, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও ঠাটারিবাজারের মতো পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় এখনও পুরোনো কুয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সচল অবস্থায় থাকা কুয়া এখন খুবই বিরল। ঢাকার অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে গেছে। সেখানে শতবর্ষী কোনো কুয়া এখনও ব্যবহারযোগ্য থাকা বিস্ময়েরই বিষয়।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের বিশেষজ্ঞ ইসমত আরা পারভিন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর জায়গাভেদে ভিন্ন। কোথাও ২০–৩০ ফুট গভীরেই পানি পাওয়া যায়, আবার কোথাও ১০০–২০০ ফুটের নিচেও যেতে হয়। পুরান ঢাকার মতো বুড়িগঙ্গার কাছাকাছি এলাকায় কুয়া থাকা স্বাভাবিক হলেও শতবর্ষী দুটি কুয়া এখনও সচল থাকা বিস্ময়কর। এগুলো শুধু পানির উৎস নয়, শহরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

তিনি বলেন, কুয়াগুলোতে এখনও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ৫০ তলা ভবনের মতো বড় নির্মাণকাজে ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত বা পরিবর্তিত হতে পারে। ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কুয়ার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিলুপ্ত হতে পারে। তাই এসব ঐতিহাসিক কুয়া সংরক্ষণ করা জরুরি।

একসময় বুড়িগঙ্গা আর কুয়ার পানিকে ঘিরে চলতো পুরান ঢাকার মানুষের জীবন। এখন সেই জায়গা দখলে নিয়েছে কলের পানি, পাইপলাইন আর আধুনিক নগরব্যবস্থা। তবুও প্রতিদিন যখন বাড়ির উঠোনের কুয়াতে বালতি নামানো হয়, দড়ি টেনে ওপরে ওঠে ঠান্ডা পানি -তখন মনে হয়, আধুনিক ঢাকার বুকের ভেতর কোথাও এখনও বেঁচে আছে পুরোনো শহরটি।

/এসবি/