শিরোনাম

সদরঘাটের ফুটপাত যাদের বিছানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সদরঘাটের ফুটপাত যাদের বিছানা
রাজধানীর সদরঘাটে ফুটপাতে ঘুমিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দিনের আলোয় সদরঘাট যেন ঢাকার স্পন্দিত হৃদপিণ্ড। লঞ্চের হুইসেল, মাঝিদের ডাক, কুলিদের ছোটাছুটি, যাত্রীদের ভিড় আর পণ্য ওঠানামার শব্দে বুড়িগঙ্গার তীর তখন জীবনের এক অবিরাম মিছিল। কিন্তু রাত নামলে সেই মিছিল ধীরে ধীরে থেমে যায়। দোকানের শাটার নামে, লঞ্চের আলো দূরে সরে যায়, মানুষের কোলাহল মিশে যায় অন্ধকারে। তখন সদরঘাটের বুক থেকে দিনের পরিচিত মুখগুলো সরে গিয়ে বেরিয়ে আসে অন্য এক শহর। যে শহরের মানুষের ঘর নেই, অথচ ঘুম আছে, বিছানা নেই অথচ ক্লান্তি আছে, ছাদ নেই, অথচ প্রতিরাতে আকাশের নিচে তাদের স্বপ্ন জেগে থাকে।

রাত গভীর হলে সদরঘাটের ফুটপাত, টার্মিনালের বারান্দা, সিঁড়ির ধাপ কিংবা জেটির আশপাশে একে একে শরীরগুলো শুয়ে পড়ে। কারও বিছানা পুরোনো একটি চট, কারও নিচে ছেঁড়া পলিথিন, কারও মাথার নিচে কাপড়ে বাঁধা সামান্য কিছু জিনিস। কেউ গায়ে জড়ান পাতলা কম্বল, কেউ শুধু পরনের কাপড়েই রাত পার করেন। দিনের ব্যস্ততায় যাদের অস্তিত্ব প্রায় অদৃশ্য, রাতের নীরবতায় তারাই হয়ে ওঠেন সদরঘাটের সবচেয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতা।

তাদের কেউ দিনমজুর, কেউ কুলি, কেউ নৌ-শ্রমিক। কেউ রিকশা চালান, কেউ হকারি করেন, কেউ বোতল-কাগজ কিংবা প্লাস্টিক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনের নানা বাঁকে তারা এসে ঠেকেছেন এই শহরের ফুটপাতে। কারও গ্রাম নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে, কারও সংসার ভেঙেছে অভাবের তাড়নায়, কেউ কাজের খোঁজে ঢাকায় এসে আর ফিরে যেতে পারেননি। এ শহর হয়তো বেঁচে থাকার জন্য তাদের কাজ দিয়েছে, কিন্তু ঘর দেয়নি।

সদরঘাটের এক কোণে রাত কাটান ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। দিনের শেষে শরীর যখন আর চলতে চায় না, তখন ফুটপাতই তার আশ্রয়। তিনি বলেন, ‘রাত হলে সবাই নিজের ঘরে ফিরে যায়। আর আমি ফুটপাতে শুয়ে আকাশ দেখি। অনেক বছর হলো নিজের বলে কোনো ঘর নেই।’

তার কথায় কোনো অভিযোগ নেই। আছে শুধু দীর্ঘ অভ্যাসের ক্লান্তি। বৃষ্টির রাত তার কাছে সবচেয়ে কঠিন। কারণ বৃষ্টি নামলে শহরের অসংখ্য মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে নিরাপদ ঘরে ঢুকে পড়ে; কিন্তু তার দরজা-জানালা বন্ধ করার মতো কিছু নেই; এমনকি মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁইও নেই।

এই একই আকাশের নিচে ঘুমিয়ে পড়ে পথশিশুরাও। দিনের আলোয় তাদের দেখা যায় লঞ্চঘাটে, সড়কের পাশে কিংবা টার্মিনালের ভিড়ে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ বোতল কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে। তাদের হাতে স্কুলব্যাগ থাকার কথা ছিল; কিন্তু সেখানে থাকে প্লাস্টিকের বস্তা আর সারাদিনের সামান্য উপার্জন।

প্রায় ১০ বছরের এক শিশুর চোখে সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের ছবি স্পষ্ট। লঞ্চ থেকে বাবা-মায়ের হাত ধরে নামা শিশুদের দিকে তাকিয়ে হয়তো সে মনে মনে ভাবে, যদি এমন একটি পরিবার থাকত! স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকত! তার ভাবনাগুলো যেন সদরঘাটের কোলাহলে মিশে যায়, শুধু রাতের নীরবতা সেগুলো নিজের কাছে রেখে দেয়।

তবে এই মানুষগুলোর স্বপ্ন খুব বড় নয়। তারা বিলাসবহুল জীবন চান না। চান একটি নিয়মিত কাজ, দিনের শেষে নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা, অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ। এক ভাসমান শ্রমিকের কথায়, ‘আমরা ভিক্ষা করতে চাই না। একটা নিয়মিত কাজ আর নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা পেলে জীবনটা বদলে যেত।’

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরঘাটের ফুটপাতে ঘুমিয়ে পড়া মানুষগুলোর চারপাশে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। শীতের রাতে কাঁপুনি, বর্ষায় ভিজে যাওয়া, গ্রীষ্মে অসহনীয় গরম, প্রকৃতির প্রতিটি ঋতুই তাদের জন্য আলাদা পরীক্ষা। অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকে না। রাতের অন্ধকারে চুরি, ছিনতাই কিংবা হয়রানির আশঙ্কাও থাকে।

তবু ভোর হলে তারা আবার উঠে দাঁড়ান।

যে মানুষটি কয়েক ঘণ্টা আগেও ফুটপাতের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই সকাল হলেই ব্যাস্ত নগরীতে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। শিশুটি আবার হাতে তুলে নেয় প্লাস্টিকের বস্তা। কুলি কাঁধে নেন বোঝা। শ্রমিক খোঁজেন দিনের মজুরি। জীবন তাদের বিশ্রামের খুব বেশি সুযোগ দেয় না।

সদরঘাটের এই রাত তাই শুধু কিছু মানুষের ঘুমের গল্প নয়, এটি নগরজীবনের এক গভীর বৈপরীত্যের গল্প। একদিকে কোটি টাকার পণ্য, হাজারো যাত্রীর যাতায়াত, ব্যস্ত বাণিজ্য ও শহরের অর্থনীতির প্রবাহ; অন্যদিকে সেই অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কিছু মানুষের নিজেরই নেই একটি স্থায়ী ঠিকানা।

তাই সদরঘাটের ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য শুধু শীতের রাতে একটি কম্বল বা গরমে হাতপাখা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পথশিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষকে রাত কাটানোর জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে না হয় ‘আজও এই আকাশটাই আমার ছাদ।’

/জেএইচ/