শিরোনাম

শাহবাগ থানায় ১৮ দিনে ২৪ অজ্ঞাত লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
শাহবাগ থানায় ১৮ দিনে ২৪ অজ্ঞাত লাশ
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম শাহবাগ। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ঘেরা এই এলাকা প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে। অথচ এই ব্যস্ততার আড়ালেই যেন তৈরি হয়েছে পরিচয়হীন মানুষের শেষ ঠিকানা। একের পর এক অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকা থেকে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ পরীক্ষা কিংবা ছবি প্রকাশ ও পরিচয় শনাক্তে নানা উদ্যোগের পরও অনেকের স্বজনের সন্ধান মিলছে না।

সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলিতে করে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে নিয়ে আসেন এক ব্যক্তি। নিজেকে কিশোরীর আত্মীয় দাবি করে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার কথা জানান তিনি। কিন্তু ট্রলি জরুরি বিভাগের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সময়ই কৌশলে সরে পড়েন ওই ব্যক্তি।

চিকিৎসকের পরীক্ষা শেষে জানা যায়, হাসপাতালে আনার আগেই মারা গেছে কিশোরীটি। এরপর শুরু হয় তার পরিচয় ও স্বজনদের খোঁজার প্রক্রিয়া। আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ অনুসন্ধান চালায়। শাহবাগ থানায় করা হয় অপমৃত্যুর মামলা। মরদেহের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউজ পোর্টালেও। কিন্তু ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ওই কিশোরীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

শুধু এই কিশোরীই নয়, গত কয়েক সপ্তাহে শাহবাগ এলাকায় একাধিক পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৭ আগস্ট জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের ইউটার্নের ফুটপাত থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ। তার পরিচয়ও জানা যায়নি।

এর আগে ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের বিপরীত পাশে ফুটওভার ব্রিজের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির মরদেহ। তারও কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) সূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞাতনামা মরদেহের সংখ্যা শুধু শাহবাগ এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন মরদেহও এই থানার নথিতে যুক্ত হয়। পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সিআইডি ও পিবিআইও এ কাজে সহযোগিতা করে। কিন্তু সব মরদেহের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি থেকেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, থানার আওতাধীন এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, জাতীয় শহীদ মিনার, তিন নেতার মাজার ও গোলাপ শাহ মাজারসহ অনেক খোলামেলা ও জনসমাগমপূর্ণ স্থান রয়েছে। এসব এলাকায় ভবঘুরে মানুষের চলাচলও বেশি। অজ্ঞাতনামা মরদেহগুলোর একটি বড় অংশ ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষের। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুর্ঘটনায় নিহত কিংবা পরিচয়হীন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালটি শাহবাগ থানার প্রশাসনিক আওতায় থাকায় সেসব মরদেহের ঘটনাও এই থানায় নথিভুক্ত হয়। ফলে এ থানায় অজ্ঞাতনামা মরদেহের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গের দায়িত্বে থাকা লিটন ইসলাম বলেন, চলতি আগস্টের ১ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালের মর্গে ২৪টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ এসেছে। এর আগে জুলাই মাসে এসেছিল অর্ধশতাধিক মরদেহ। এর বেশিরভাগই শাহবাগ থানা এলাকাসহ রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়।

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ফারুক হোসেন বলেন, পরিচয়হীন রোগী ও মরদেহের চিকিৎসা এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় পুলিশ সহযোগিতা করে। রেল ও সড়ক দুর্ঘটনা, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেক অজ্ঞাতনামা মানুষ হাসপাতালে আসেন। এদের কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে বা মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলে নিয়ম অনুযায়ী মরদেহ শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। এছাড়াও হাসপাতালে অসুস্থ বা মৃত ব্যক্তিকে রেখে স্বজনের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তা বলেন, অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকে না। আবার কারও আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়। মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে পচন ধরার কারণে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকলেও অনেক সময় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও পরিচয় না মিললে পুলিশ মরদেহের ছবি ও তথ্য প্রকাশ করে। এরপরও স্বজনের সন্ধান না পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট সময় পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় দাফন করা হয়। তবে এমনও ঘটনা রয়েছে, দাফনের ঠিক আগে কিংবা দাফনের পর স্বজনরা এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) প্রশাসনিকভাবে শাহবাগ থানার আওতাধীন হওয়ায় অজ্ঞাতনামা মরদেহ শনাক্তকরণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সমন্বয়ের বড় একটি দায়িত্ব পড়ে এই থানার ওপর। মর্গকেন্দ্রিক কাজ পরিচালনায় শাহবাগ থানার দুজন উপপরিদর্শক ও দুজন কনস্টেবল দুই ধাপে আট ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কাজের মধ্যে থাকে মরদেহ গ্রহণ, পরিচয় শনাক্তে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং স্বজনের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো মরদেহের পরিচয় জানা না গেলেই সেটিকে শুধু বেওয়ারিশ বা ভবঘুরে হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ একটি পরিচয়হীন মৃত্যুর পেছনে দুর্ঘটনা, অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত অপরাধসহ যেকোনো কারণ থাকতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) অজ্ঞাতনামা রোগী ও মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক ইউনিট থাকা প্রয়োজন। সড়ক বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার পর কাউকে হাসপাতালে নিয়ে এলে শুধু আহত ব্যক্তির চিকিৎসা নিশ্চিত করাই নয়, তাকে কে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে, তার পরিচয় কী- সেটিও নথিভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে রোগীর শরীরে থাকা বিশেষ কোনো দাগ বা শনাক্তযোগ্য চিহ্ন এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সুরতহাল প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা দরকার।

তিনি বলেন, পরিচয়হীন মানুষকে শুধু একটি সংখ্যা বা একটি মরদেহ হিসেবে দেখার পরিবর্তে নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তার পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি কীভাবে মৃত্যু হলো, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করা জরুরি।

/এসবি/