শিরোনাম

চিঠি দিবসে না বলা কথার চিঠি

গবি সংবাদদাতা
গবি সংবাদদাতা
চিঠি দিবসে না বলা কথার চিঠি
উপরের বাঁ পাশ থেকে: নোশিন, ঊর্মি, শারু (শারাফ) ও আশিক

ব্যস্ততম জীবনের নানান ব্যস্ততায় প্রিয় মানুষটিকে ছেড়ে থাকতে হয় অনেক দূরে। আজকের আধুনিক বিশ্বে ইচ্ছা করলেই প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, বলা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা। কিন্তু একসময় দূরদূরান্তের প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। অপেক্ষা ছিল চিঠির। খামে বন্দী কয়েকটি শব্দে লুকিয়ে থাকত ভালোবাসা, অভিমান, বন্ধুত্ব কিংবা না বলা অসংখ্য কথা। সময়ের সঙ্গে সেই চিঠি হারিয়ে গেছে দ্রুতগতির যোগাযোগের ভিড়ে। তবু কিছু কথা আছে, যা মুঠোফোনের ছোট্ট বার্তায় বলা যায় না—যে কথাগুলো কাগজে-কলমে লিখলেই যেন সবচেয়ে বেশি সত্যি হয়ে ওঠে।

তাই বিশ্ব চিঠি দিবসে চিঠির দিনে ফিরে যেতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রিয় মানুষের জন্য না বলা কথার কিছু চিঠি সংগ্রহ করেছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদদাতা মো. মাহিদুজ্জামান সিয়াম। প্রিয় মানুষদের উদ্দেশে লেখা চার চিঠিতে উঠে এসেছে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুত্বের স্মৃতি, বোনের প্রতি আরেক বোনের আত্মার টান এবং দূরত্বের মাঝেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার গল্প।

প্রিয় আম্মু,

আশা করি ভালোই আছো। অনেকদিন হলো তোমাকে মনের কথাগুলো বলা হয় না, বলতে পারি না। তাই ঠিক করেছি, আজ চিঠির মাধ্যমেই আমার না বলা কথাগুলো তোমার কাছে পৌঁছে দেব।

এই নশ্বর, নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তোমার মতো ভালো কেউ বাসেনি। আমার সব হাসি, সুখ, ভালো থাকার পেছনে থাকে তোমার ত্যাগ ও পরিশ্রম। ছোট থেকে আজ পর্যন্ত তুমি আমাকে যেভাবে আগলে রেখেছো, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছো, তার জন্য আমি তোমার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। যেদিন বাসা ছেড়েছিলাম, সেদিন থেকেই তোমার অভাব আমাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করেছে। আমার কতশত ভুল হাসিমুখে মাফ করে দিয়েছো, কত কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। এখন বড় হয়ে বুঝতে পারছি, তোমার সঙ্গে বোধহয় বড্ড অন্যায়ই করে ফেলেছি।

তুমি না থাকলে আমার এই জীবনের পথচলা এতটা সহজ হতো না। তুমি আমার প্রথম শিক্ষক, আমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং সবচেয়ে ভালো বন্ধু। যেসব কথা আমি কাউকে বলতে পারি না, সেসব আমি তোমাকে বলতে পারি। সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, তুমি যেন সবসময় সুস্থ থেকো আর হাসিমুখে আমার পাশে থেকো।

আজ এ পর্যন্তই। ভালো থেকো, আম্মু।

ইতি,

তোমার শারু (শারাফ)

প্রিয় বাবা,

কেমন আছো তুমি? এই ব্যস্ত শহরের কোলাহলময় জীবনে তোমায় ভীষণ মনে পড়ে। হোস্টেলের এই একঘেয়েমিময় জীবন কঠিনভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়, ‘বাবার সব সময় পাশে না থাকার মানে।’ বাসায় যখন থাকতাম, কখনো ভাবিনি একটা অসুখ, একটা সমস্যা বা শুধু মনমতো না হওয়া একটা খারাপ দিন কতটা কঠিন হতে পারে, যখন কেউ পাশে থাকে না।

এখানে বয়ে নিয়ে চলা নিজের নিঃসঙ্গতার কষ্ট, একাকিত্ব, দায়িত্ব, দুশ্চিন্তা, হতাশা আমাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। তোমার কাঁধে ভর দিয়েছিলাম বলেই বুঝিনি, কতখানি কঠিন এই ভার বয়ে চলা।

জানো বাবা, এখানে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটে যায় অনিয়মের বেড়াজালে। কেউ পাশে এসে তো মাথায় হাত বুলিয়ে বলে না, ‘বাবা, এমন অনিয়ম করলে হবে? ঠিক সময়ে খাবে, ঠিকমতো ঘুমাবে। তাহলে শরীর, স্বাস্থ্য, মন—সব ভালো থাকবে।’

আমার এখনো মনে আছে, আমি যখন গুটি গুটি পায়ে দৌড়াতে শিখেছিলাম, সারাদিন অপেক্ষায় থাকতাম কখন তুমি কাজ শেষে বাড়ি ফিরবে। তুমি কাজ শেষে বাড়ি ফিরে অপেক্ষায় থাকা আমাকে তোমার বুকের ওপর নিয়ে পরম স্নেহে ঘুম পাড়াতে। তখন থেকে আজ অবধি উপলব্ধি করেছি, বাবাদের বুক পৃথিবীর সমস্ত ভয় ভুলে যাওয়ার এক নিরাপদ স্থান। যেখানে ক্লান্তি এসে নীরবে ঘুমিয়ে পড়ে, চোখের জলও আশ্রয় পায় নির্ভয়ে।

কঠিন দুনিয়ার এই বেড়াজালে আবদ্ধ হৃদয় তোমায় খুব মিস করে, বাবা। বাবা, তোমাকে ‘ভালোবাসি’ বলাটা আমাদের সংস্কৃতিতে বোধহয় ভীষণ কঠিন। কিন্তু আজ তোমাকে বলতে চাই, ‘তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, বাবা।’

নিজের শরীরের যত্ন নিও। ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো আর আমার জন্য অনেক দোয়া রেখো।

ইতি,

তোমার পরম স্নেহ ও আদরের

নোশিন

প্রিয় সৈকত,

কেমন আছো? আশা করি ভালো আছো। আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ইদানীং তোমাকে বেশ মিস করি। বিশেষ করে বিকেলগুলো যখন ঘরে বন্দী হয়ে কাটে, তখন কলেজজীবনের কথা মনে পড়ে যায়—তোমার সঙ্গে প্রতিদিন আসরের নামাজ পড়ে হাঁটতাম, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুক্তিতর্ক ও আলোচনা হতো, মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরতাম। আন্টি তোমাকে আসতে বারণ করতেন, তবুও তুমি চলে আসতে।

আমার শৈশব ও স্কুলজীবনেরও অনেক ভালো বন্ধু আছে। তবে তুমি তাদের চেয়েও একটু বেশি বিশেষ। আমি মাঝে মাঝে তোমাকে নিয়ে নিজের কাছেই গর্ব করি—ভাবি, আমি বড্ড সৌভাগ্যবান একজন মানুষ, যে তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি।

কলেজজীবনে ঘটে যাওয়া ভালো-মন্দ সব সময়েই তুমি যেভাবে আমার পাশে থেকেছো, সেসব আমি আজও নিজের মধ্যে সযত্নে ধারণ করি। তোমার কি মনে আছে? তোমার নানা যখন ইন্তেকাল করলেন, আমি কিছুদিন পর সেই সংবাদ জানতে পেরেছিলাম। তখন আমার নিজের দিনগুলোও বেশ খারাপ যাচ্ছিল। এমন সময়ে আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং তিন-চার দিন থেকেও এসেছিলাম। সেই সময়ের স্মৃতিগুলো এখনো আমার মনে পড়ে। সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর কিছু তখনই কেটেছিল। মানুষ চাইলে তার জীবনের সবকিছুই অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে—তুমি তার সুন্দর একটি উদাহরণ।

সেসব দিনের কথা এখন তোমাকে আরও বেশি মনে করিয়ে দেয়। বিশেষ করে তুমি চট্টগ্রামে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তোমার সঙ্গে সেভাবে আড্ডা দেওয়া আর হয়ে ওঠে না। তবে আড্ডাটাই বড় বিষয় নয়; তুমি পাশে বসে থাকলেও ভালো লাগে। যেসব কথা সচরাচর কারও সঙ্গে বলতে পারি না, সেসব তোমার কাছে মন খুলে বলতে পারি। তখন নিজেকে অনেক হালকা লাগে।

শেষবার তোমাদের দোহারে গিয়ে জাকির আর তোমার সঙ্গে যে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছিলাম, সেগুলোও অনেক মিস করি। ভাবি, আবার কবে তোমার সঙ্গে নদীর পাড়ে বসব, মন খুলে কথা বলব। যদিও এই যান্ত্রিকতার যুগে প্রায়ই ফোনে তোমার সঙ্গে এক থেকে দেড় ঘণ্টা কথা হয়ে যায়, তবুও কেন যেন মন ভরে না। কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়েই যায়।

আন্টিকেও আমি খুব মিস করি। বহুদিন আন্টির সঙ্গেও কথা হয় না। আন্টিকে আমার সালাম জানিও।

সময় পেলে আমাকে চট্টগ্রামে দাওয়াত দিও। তোমার কাছ থেকে চেয়ে দাওয়াত নিতে কেন যেন আরও ভালো লাগে।

ইতি,

তোমার বন্ধু

আশিক

প্রিয় বোন,

চিঠি লিখতে বসে ভাবছি, তোকে কী লিখব! কারণ তোকে নিয়ে লিখতে গেলে কয়েকটা শব্দ কখনোই যথেষ্ট মনে হয় না। তুই শুধু আমার বোন না, তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমার সব কথা বলার মানুষ, আমার সোলমেট তুই।

আমাদের সম্পর্কটা আমার কাছে সবসময়ই একটু অন্যরকম। জীবনের ভালো সময়গুলো যেমন একসঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি, তেমনি খারাপ সময়েও একে অপরের পাশে থেকেছি। এমন অনেক কথা আছে, যা হয়তো অন্য কাউকে বলা যায় না, কিন্তু তোকে বলতে কখনো ভাবতে হয় না। আমার হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান, ভয় কিংবা ছোট ছোট আনন্দ—সবকিছুর সঙ্গেই তুই জড়িয়ে আছিস।

সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে যখন আমরা একসঙ্গে বসে ছোটবেলার কথা মনে করি। কত স্মৃতি, কত হাসাহাসি, কত ছোট ছোট ঘটনা—সেগুলো মনে করলে মনে হয়, সময়টা যদি আরেকটু ফিরে আসত! তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি ছোটবেলার সেই দিনগুলো কত সুন্দর ছিল, আর সেই সুন্দর স্মৃতিগুলোর প্রায় সবখানেই তুই আছিস।

এখন পড়াশোনার কারণে আমরা দূরে থাকি। আগের মতো যখন ইচ্ছা দেখা করা হয় না, একসঙ্গে বসে গল্প করা হয় না। তবুও দূরত্ব কখনো আমাদের সম্পর্ককে দূরে নিতে পারেনি। দেখা না হলেও, কথা কম হলেও, দিনের কোনো না কোনো মুহূর্তে তোকে মনে পড়েই। কারণ কিছু মানুষ দূরে থাকলেও মনের খুব কাছেই থাকে—তুই আমার কাছে ঠিক তেমনই।

জীবনে অনেক কিছু বদলাবে, সময় বদলাবে, আমরা হয়তো আরও ব্যস্ত হয়ে যাব। কিন্তু আমি চাই, আমাদের এই সম্পর্কটা যেন কখনো না বদলায়। ভালো সময় হোক বা খারাপ সময়, হাসি হোক বা কান্না—আমরা যেন সবসময় আগের মতোই একে অপরের পাশে থাকতে পারি।

তুই আমার জীবনের এমন একজন মানুষ, যাকে পেয়ে আমি সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। বোন হিসেবে তোকে পেয়েছি, কিন্তু তার থেকেও বেশি পেয়েছি একজন সত্যিকারের বন্ধু, একজন আপন মানুষ।

ভালো থাকিস সবসময়। আর মনে রাখিস, দূরে থাকলেও তোর একজন মানুষ সবসময় আছে—যে তোকে প্রতিটা মুহূর্তে মনে করে এবং সবসময় তোর পাশে থাকবে।

অনেক অনেক ভালোবাসা রইল।

ইতি,

সানজিদা খানম ঊর্মি

/এমআর/