শিরোনাম

জাবিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

জাবি প্রতিনিধি
জাবিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নামে খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ৭০০ একরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে ইটের দেয়ালে তৈরী সীমানাপ্রাচীর থাকলেও নানান সময়ে বহিরাগত কর্তৃক ক্যাম্পাসে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য প্রশ্ন উঠেছে এই সীমানাপ্রাচীর কি আদৌ নিরাপত্তাবেষ্টনী?

ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক গুলোর অরক্ষিত অবস্থার কারণে বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হয়। প্রশাসনের দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকা, অতিরিক্ত ঝোপঝাড় ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকাকে এসব দূর্ঘটনার প্রধান দায়ী বলে জানিয়েছেন স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত সাতটি স্থানে সীমানা প্রাচীর অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আল বেরুনী হলের পেছনের খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকা, বিশমাইল সংলগ্ন গেইট, সেন্ট্রাল ফিল্ড, মনপুরা এলাকা, জাবি স্কুল ও কলেজ সংলগ্ন এলাকা, কলাবাগান, মীর মশাররফ হোসেন হলের পাশে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এলাকা এবং নবাব ফয়জুন্নেছা হলের সীমানা প্রাচীর।

এসব অরক্ষিত পথ ব্যবহার করে বহিরাগতরা অবাধে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করছে। পর্যাপ্ত আলো ও নজরদারি না থাকায় এসব পয়েন্ট দিয়ে মাদক সরবরাহ ও সেবন বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা জানান, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা, আপত্তিকর ছবি তোলা এমনকি চুরির মতো অপরাধও ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আল বেরুনী হলের পেছনের মাঠটির প্রাচীর দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত থাকায় সেটি মাদককারবারিদের নিরাপদ পথে পরিণত হয়েছে।

ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে অর্থনীতি বিভাগের ৫০তম ব্যাচের কাজী মৌসুমি আফরোজ বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার জায়গা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ও হওয়ার কথা। কিন্তু আজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ক্যাম্পাসেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ক্যাম্পাসের ফটকগুলো অরক্ষিত, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নেই, আর এর ফলেই বারবার শিক্ষার্থীরা হামলা, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই ঘটনার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না। অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ফটকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা কোনো আশ্বাস না, বাস্তব পদক্ষেপ চাই। একজন শিক্ষার্থীও যেন আর নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয় সেটাই আমাদের দাবি।

মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, গত কিছুদিন ধরে আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের হাতে বারবার হেনস্তা ও অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রশাসন যেন কেবল বড় কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থাকে। ছোট ছোট ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার সংস্কৃতিই আজ অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। বহিরাগতদের দ্বারা কোনো ঘটনা ঘটলে কেবল ক্যাম্পাস ছাড়া করা নয়, বরং প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপদ ক্যাম্পাস আমাদের অধিকার, কোনো করুণা নয়।

৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ক্যাম্পাসে কিছুদিন পরপরই বহিরাগতদের দ্বারা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসের ফটকগুলো অরক্ষিত থাকায় যে কেউ সহজে প্রবেশ করতে পারছে। অথচ বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই দ্রুত ফটকগুলোতে কড়াকড়ি, পরিচয় যাচাই, নিয়মিত টহল ও বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্যাম্পাসের চারপাশে সীমানাপ্রচীর নির্মাণ করতে হবে। নিরাপদ ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার, এটি অবহেলার বিষয় নয়। যদি প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নেয় তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো।

জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, গতকাল আমরা জাকসু সদস্যরা প্রশাসনের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবি পেশ করেছি। নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আমরাও কাজ করে যাচ্ছি। ক্যাম্পাস নিরাপদ, সুন্দর হয়ে উঠুক এটাই প্রত্যাশা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমাদের নিরাপত্তা শাখায় লোকবলের সংকট সবচেয়ে বেশি। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ অনেকগুলো হওয়ায়, নিরাপত্তা বেষ্টনী অরক্ষিত হওয়া ছাড়াও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পুলিশের নিয়মিত অভিযান না থাকার কারণে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীরা সহজে ঢুকতে পারে। প্রশাসনের সাথে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আরও লোকবল নিয়োগ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কিছু ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি যেমন দেয়ালে কাঁটাতার লাগানো ও উঁচুকরণ। কিছু জায়গায় এখনো গ্যাপ রয়ে গেছে। নিরাপত্তায় শাখায় খুব দ্রুত কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে। মহিলা নিরাপত্তা কর্মীও নিয়োগ দিবো আমরা। সত্যি বলতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত নিষিদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ সজাগ হতে হবে।

/এমআর/