শিরোনাম

উপদেষ্টাদের প্রভাবশালী পিএস–এপিএসরা কে কোথায়

উপদেষ্টাদের প্রভাবশালী পিএস–এপিএসরা কে কোথায়
পরিবেশ উপদেষ্টার সাবেক পিএস আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাবেক এপিএস মাহবুবুর রহমান (ছবি: সংগৃহীত)

আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান অন্তবর্তীকালীন সরকারের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে তিনটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বন, পরিবেশ ও জলবায়ূ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালনকালে অনেক প্রভাব খাটিয়েছেন তিনি। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে বদলি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন জীবন বীমা করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি সেখানে যোগ দেন।

জানা গেছে, ২০২১ সালের ৩১ মে আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খানকে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন তৎকালীন সরকার। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী এ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ২৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করে কিছুদিন পরেই ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসেন। সাবেক মূখ্যসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঙ্গে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। এরপর জেলা প্রশাসক থেকে তোফাজ্জল হোসেন মিয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলে তার সঙ্গে মারুফ খানকে নিয়ে যান। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মারুফ খানের অনিয়ম দূর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলে তিনি আবারও আলোচনায় আসেন। নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর বিগত সরকারের প্রভাবশালীদের তালিকা তৈরি করছে বলে জানা গেছে।

যুব, ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের ৪০০ কোটি টাকার মালিক হন। এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

যুব, ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি করে ৪০০ কোটি টাকার মালিক হন। এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদবির বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এ ঘটনায় গত বছরের ৮ এপ্রিল মোয়াজ্জেম হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ২১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

অপরদিকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) তুহিন ফারাবী ও সাবেক এপিএস মাহমুদুল হাসান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে অব্যাহতি পাওয়া নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে তলব করে দুদক।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন আকন্দ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দীন ও একান্ত সহকারী সচিব ছিলেন আমান সাদিক। বর্তমানে তারা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এই তথ্য বুধবার ওই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফট্যানেন্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর একান্ত সচিব মনিরুজ্জামান বকাউল সম্প্রতি উপসচিব হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় যোগদান করেছেন। একই উপদেষ্টার এপিএস মাহবুবুর রহমান নিজ বাসায় চলে গেছেন। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি গত মঙ্গলবার বাসায় চলে গেছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবীর খানের একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চলে গেছেন। এপিএস মেহেদী হাসান বিদ্যুৎ বিভাগে যোগদান করেছেন। তিনি সরকারের সিনিয়র সহকারী সচিব। বুধবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাদের পিএস–এপিএসের নাম বলতে অনীহা প্রকাশ করে ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের একান্ত সচিব (পিএস) মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম (যুগ্ম সচিব) ও এপিএস মুশফিকুল আলম হালিমকে (সিনিয়র সহকারী সচিব) ১১ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তাদের ইশারায় চলতেন উপদেষ্টারা।

সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন মুরসিদের পিএস তারেক মোহাম্মদ জাকারিয়া দুই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে।

১১ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চার উপদেষ্টার পিএসকে (একান্ত সচিব) অন্যত্র বদলি করা হয়। এর মধ্যে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরারের একান্ত সচিব এ কে এম তাজকির-উজ জামানকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পিএস মুকতাদিরুল আহমেদকে অর্থ বিভাগের উপসচিব পদে বদলিপূর্বক পদায়ন করা হয়। নৌপরিবহন উপদেষ্টার পিএস মো. জাহিদুল ইসলামকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উপসচিব পদে বদলি করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর একান্ত সচিব (পিএস) মো. কুতুব আল-হোসাইনকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব পদে বদলি করা হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. আবু ওয়াদুদকে অর্থ বিভাগের উপসচিব পদে বদলি করা হয়।

অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় এসব কর্মকর্তারা অনেক ক্ষমতাধর হিসেবে প্রশাসনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বিগত সরকারের পিএস–এপিএসদের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার প্রথম দিনই অধিকাংশ উপদেষ্টার দপ্তরের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের একযোগে বদলি করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘দপ্তরে যোগদান করার পরে মন্ত্রী চাচ্ছেন যে, আগে যারা কর্মরত ছিলেন তাদেরকে যেন সেখানে না রাখা হয়। এখন মন্ত্রী না চাইলে তো আমাদের কিছু করার নেই।’

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সাবেক পিএস মামুন শিবলী বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এপিএস ১ এবং প্রধান উপদেষ্টার আরেক বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমানের সাবেক পিএস মহিউদ্দিন আল হেলাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপপরিচালক হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপদেষ্টাদের দপ্তরের প্রায় অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে বদলি করা হয়েছে।

/বিবি/