শিরোনাম

বন্যার পানি কমলেও কমেনি দুর্ভোগ, চট্টগ্রামজুড়ে খাদ্যসংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্যার পানি কমলেও কমেনি দুর্ভোগ, চট্টগ্রামজুড়ে খাদ্যসংকট
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে লোকালয়

পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে। শনিবার (১১ জুলাই) বান্দরবান ছাড়া অন্যান্য জেলায় পানি কিছুটা কমেছে। তবে এখনো পানিবন্দী রয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। রান্না করার সুযোগ না থাকায় পরিবারগুলো দিনের পর দিন শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করছে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

বাঁশখালীর দক্ষিণ ইলশা গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী করিম শেখ বলেন, টানা ছয় দিন ধরে ঘরে রান্না হয়নি। স্ত্রী ও সাত সন্তানকে নিয়ে মুড়ি, বিস্কুট ও কলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। আর্থিক সংকটের কারণে বাইরে থেকে খাবার কিনতেও পারিনি।

একই এলাকার নেছার উদ্দিন বলেন, বন্যার পানিতে আমার ঘরের ধান-চাল, নগদ অর্থ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি এমনকি পরনের কাপড়ও নষ্ট হয়ে গেছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন বলেন, প্রতিদিন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চলছে। কেউ যদি এখনো সহায়তা না পেয়ে থাকেন, তাদের দ্রুত ত্রাণের আওতায় আনা হবে।

এদিকে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার বড়পাড়া থেকে দোহাজারীর পাঠানি ব্রিজ ও সোনার বটতলা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে এখনো হাঁটুপানি রয়েছে। ঝুঁকি নিয়েই এসব এলাকা দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করছে।

চন্দনাইশ উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যাদুর্গতদের জন্য ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে এবং দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের জন্য ১০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব কিছুটা কমলেও দুর্যোগের ক্ষত এখনো স্পষ্ট। শনিবার (১১ জুলাই) সকালে ঈদগাঁও উপজেলার ফুলেশ্বরী খাল থেকে ঢলের পানিতে ভেসে যাওয়া সাজিদুল ইসলাম নামে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে ও দেয়ালচাপায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় কক্সবাজারসহ দেশের চার সমুদ্রবন্দর থেকে সতর্ক সংকেত প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে সেন্ট মার্টিন ও মহেশখালীর নৌপথে চলাচল আবার শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, চার দিন ধরে রেললাইনে পানি জমে থাকায় কক্সবাজারের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ এখনো বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনাও অর্ধেকে নেমে এসেছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও পটিয়া এলাকায় মহাসড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সড়ক যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।

বান্দরবানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। শুক্রবার পানি কমার পর শনিবার সকাল থেকে আবার পানি বাড়তে শুরু করায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার কালাঘাটা, কাসেমপাড়া, মেম্বারপাড়া, ইসলামপুর, বনরূপাপাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন, ক্যাচিংঘাটা, নোয়াপাড়া ও শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবারের তুলনায় পানির উচ্চতা প্রায় সাত ফুট বেড়েছে।

এখনো সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে রুমা, লামা ও বান্দরবানের বিভিন্ন নদীপথে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া ১২২টি পরিবারকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছে বিজিবি।

এদিকে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস-দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়ে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর পানি বাড়তে থাকায় কুড়িগ্রামসহ রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চলে আবারও স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। শনিবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

/এসবি/