শিরোনাম
দলীয় নেতাদের নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার: রয়টার্স

দলীয় নেতাদের নিয়ে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা শেখ হাসিনার: রয়টার্স

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ভারতে নির্বাসিত জীবন শেষ করে আগামী ডিসেম্বর মাসের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকার দেন শেখ হাসিনা। শুক্রবার (১০ জুলাই) এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক গমাধ্যমকে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও সাক্ষাৎকার দেননি।

গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এনডিটিভিকে ই-মেইলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বছরই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তবে এবার তিনি সুনির্দিষ্ট সময়ের আভাস দিলেন।

শেখ হাসিনাকে রয়টার্সকে বলেন, দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকী হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চলছে। যদি মৃত্যুও হয়, আমি দেশের মাটিতেই মরতে চাই– যেখানে আমার মা-বাবা সমাহিত এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। আমি সবাইকে বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরব। তোমাদেরও একদিন ফিরতে হবে। সবাই মিলে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করবো।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ঢাকা বারবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। তবে আমি নিজেই যাব।

রয়টার্স লিখেছে, শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভক্তি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন বর্তমান বিএনপি সরকার দুই বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আবার শেখ হাসিনা ফিরলে তা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলাতেও সাহায্য করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার এই মন্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। আমি সবাইকে বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরব। তোমাদেরও একদিন ফিরতে হবে। সবাই মিলে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করবো।

তবে কবে দেশে ফিরবেন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ সাক্ষাৎকারে বলেননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক– আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।

সাক্ষাৎকারে হাসিনা দাবি করেন, দেশে ফেরার বিষয়ে ঢাকা বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তিনি কোনো আলোচনা করেননি। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।

কারাগারে যেতে হলে তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই দাবি করে ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী জানান, এর আগেও তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফেরার পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে এবং ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, যখন কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ বা ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।

টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর কেন দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন, সে বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার বাসভবনের দিকে যখন জনতা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন জীবন শঙ্কা থেকেই তিনি দেশ ছাড়েন।

তিনি বলেন, যখন কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ বা ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।

দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করার কথা বলেন শেখ হাসিনা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তারা হয়ত আমাকে সাজা দিয়েছে এবং আমি হয়ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবো না। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে জনগণকে সেটা সিদ্ধান্ত নিতে দিন।

শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। তবে তার বা দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে রয়টার্স যোগাযোগ করতে পারেনি।

/এফসি/