শিরোনাম

জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়তে প্রয়োজন সবার অংশীদারত্ব

বুশরা শাহরিয়ার
বুশরা শাহরিয়ার
জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়তে প্রয়োজন সবার অংশীদারত্ব
কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর অনেক সড়কে পানি জমে যায়

প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য– কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ঢাকা স্থবির। রাস্তা পানির নিচে, যানজট, ব্যবসায় ক্ষতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, জনজীবন বিপর্যস্ত।

বছরের পর বছর ড্রেন নির্মাণ, পাম্পিং স্টেশন, খাল পুনরুদ্ধারসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়– কেন একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে?

কারণ আমরা এখনো জলাবদ্ধতাকে মূলত একটি প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখি।

কিন্তু বাস্তবে এটি নীতি, সুশাসন, সমন্বয় এবং জনগণের অংশগ্রহণের সমস্যা।

নীতিতে যে ঘাটতি রয়ে গেছে

বর্তমান পরিকল্পনাগুলো অধিকাংশই ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতিতে তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত নেন সরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা, কিন্তু যাঁরা প্রতি বছর জলাবদ্ধতার কষ্ট ভোগ করেন, তাঁদের মতামত পরিকল্পনার অংশ হয় না।

অথচ স্থানীয় মানুষই সবচেয়ে ভালো জানেন–

• কোথায় আগে পানি জমে।

• কোন ড্রেন বছরের পর বছর বন্ধ।

• কোথায় ময়লার কারণে পানি আটকে যায়।

• কোন খাল দখলের কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।

এই অভিজ্ঞতা পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।

একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক সমাধান

আমার গবেষণার ভিত্তিতে আমি একটি কমিউনিটি রেজিলিয়েন্স ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্ক (সিআরআইএফ) প্রস্তাব করেছি, যেখানে জলাবদ্ধতা মোকাবিলার দায়িত্ব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং সব অংশীজনের।

সরকারের দায়িত্ব

• সমন্বিত নগর বন্যা নীতি প্রণয়ন।

• খাল, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ।

• আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

• বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।

• ওয়ার্ডভিত্তিক ‘আরবান ফ্লাড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ চালু করা।

সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব

• বর্ষার আগে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার।

• কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

• অবৈধ দখল উচ্ছেদ।

• জলাবদ্ধতার রিয়েল-টাইম তথ্য প্রকাশ।

রাজউক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের দায়িত্ব

• নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।

• জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা রক্ষা।

• জল-সংবেদনশীল (ওয়াটার-সেনসিটিভ) নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব

• গবেষণাভিত্তিক নীতি সুপারিশ প্রদান।

• ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরি।

• প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন।

• কমিউনিটির মতামত নীতিনির্ধারণে পৌঁছে দেওয়া।

কমিউনিটির দায়িত্ব

কমিউনিটি শুধু ভুক্তভোগী নয়; সমাধানেরও অংশ।

• ড্রেনে বর্জ্য না ফেলা।

• স্থানীয় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।

• বন্ধ ড্রেন বা খালের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানো।

• দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ।

• পরিকল্পনা প্রণয়নে নিজেদের মতামত দেওয়া।

গণমাধ্যমের দায়িত্ব

শুধু জলাবদ্ধতার ছবি প্রকাশ নয়; বরং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।

বেসরকারি খাতের দায়িত্ব

• সবুজ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ।

• করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) মাধ্যমে স্থানীয় সহনশীলতা কর্মসূচি সমর্থন।

• জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি: আগাম সতর্কীকরণ

বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও নদীভিত্তিক বন্যার আগাম সতর্কীকরণে সফল হলেও নগর জলাবদ্ধতার জন্য কার্যকর ওয়ার্ডভিত্তিক ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ এখনো গড়ে ওঠেনি।

যদি নাগরিকরা মোবাইল ফোনে আগাম বার্তা পান– কোন এলাকায় পানি জমবে, কোন সড়ক এড়িয়ে চলতে হবে, কত সময়ের জন্য ঝুঁকি থাকবে– তাহলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং জরুরি সেবা অনেক বেশি প্রস্তুত থাকতে পারবে।

এখন প্রয়োজন নতুন চিন্তা

ঢাকার জলাবদ্ধতা কেবল ড্রেন বড় করে সমাধান করা যাবে না।

প্রয়োজন এমন একটি ‘কমিউনিটি-সেন্টার্ড আরবান ফ্লাড রেজিলিয়েন্স ফ্রেমওয়ার্ক, যেখানে সরকার, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, গবেষক, প্রকৌশলী, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি কমিউনিটি– সবাই সমান অংশীদার হবে।

কারণ একটি সহনশীল (রেজিলিয়েন্ট) শহর কেবল অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় সমন্বিত নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

লেখক: নগর বন্যা সহনশীলতা (আরবান ফ্লাড রেজিলিয়েন্স) গবেষক ও পিএইচডি গবেষক, আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিং বিভাগ, আইআইটি রুরকি, ভারত

প্রভাষক, স্থাপত্য বিভাগ, স্ট্যাম্ফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

/এফসি/