ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া

ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া
পবিত্র কুণ্ডু

অপ্রত্যাশিতভাবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে পারেননি আমিনুল হক। তবু্ও হলেন নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপার। সাফ ও সাফ গেমসের শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক। খেলার মানুষ, মাঠের মানুষ। আমিনুল নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিলেন। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ভাবী প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছিলেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান। আই হ্যাভ আ প্ল্যান।
এই প্ল্যানে যে ক্রীড়াঙ্গন ছিল, সেটি তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারই বলে দিয়েছে। আর আমরা তো জানি ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্যে মূর্ত হয় জনতার অবাধ উচ্ছ্বাস আর আবেগ। ক্রীড়াঙ্গনের চরিত্র মূলত অরাজনৈতিক, ভাষা সর্বজনীন আর সংগীতটা সাম্যের।
ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা-এই প্রতিপাদ্যে গত ৩০ মার্চ দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে দিলেন ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা। কদিন পর আরো ১৭১ জনকে তালিকাভুক্ত করে প্রাথমিকভাবে ৫০০ জনের প্রকল্পে সংখ্যাটা উন্নীত করা হয়েছে ৩০০ জনে। বিভিন্ন খেলার এই খেলোয়াড়েরা মাসিক ১ লাখ টাকা ভাতা পাবেন। তিন মাস অন্তর পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে খেলোয়াড়দের ভাতা প্রাপ্তির তালিকাটা সংশোধিত হতে থাকবে।আগেও যে খেলোয়াড়দের ভাতা দেয়া হয়নি, তা নয়। কিন্তু ক্রিকেট বাদে অন্যান্য ক্রীড়া ফেডারেশনভিত্তিক সেই ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত এবং যৎকিঞ্চিত। কোনো অবস্থাতেই খেলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার মতো উৎসাহ তা জোগাতো না। নৈরাশ্য কিংবা উৎসাহহীনতার সেই জায়গাটিতে একটি প্রবল আশাবাদ নিয়ে এসেছে নতুন এই প্রণোদনা। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের নারী হকি দল ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বে রানার্সআপ হয়ে মূল পর্বের টিকিট পেল। আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের র্র্যাংকিংয়ে এখনো নামই ওঠেনি, প্রথম আন্তজার্তিক টুর্নামেন্ট।
সেরা চারে থেকে কোয়ালিফাই করাটাই যেখানে সংশয়ে ঢাকা, মেয়েরা সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালেই উঠে গেল। সেখানেও দুর্ভাগ্য পিছু না নিলে চ্যাম্পিয়ন হয়েই ফিরতো। কী এই অভাবিত সাফল্যের রহস্য? অর্পিতা-রিয়ারা বললেন, ক্রীড়াভাতা পেয়ে মনটা ফুরফুরে, নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে খেলতে ভেতর থেকেই অন্যরকম অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তারা।
বাছাই করা খেলা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। মূলধারার খেলাগুলোর দিকে আরো বেশি নজর না দিয়ে ব্রিজ, ক্যারম, রাগবি, সেপাক টাকরো ইত্যাদি অপ্রধান খেলা বাংলাদেশের সমাজে কী প্রভাব ফেলবে, সেই প্রশ্ন থাকছে।
এরই পাশাপাশি আমরা উন্মোচিত হতে দেখলাম নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৬ সালে শিশু-কিশোরদের পারফর্মিং আর্টের প্রতিযোগিতার আদলে দেশব্যাপী ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণের বাছাই প্রতিযোগিতা চলছে। এখান থেকেই ছেঁকে আনা হবে আগামীর তারকাদের। এই প্রথম প্রতিভা অনুসন্ধান শুরু হলো, বিষয়টি এমনও নয়। এর আগে বহুবার বহুরূপে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশন, জাতীয় পরিষদ, ক্রীড়া পরিদপ্তর এই কাজটি করেছে। তারপরও সাড়ম্বরে আরম্ভ হওয়া নতুন সরকারের এই কর্মসূচির সাফল্যের অপেক্ষায় থাকতে চায় ক্রীড়ামনষ্ক বাংলাদেশ। সবার আশা নতুন প্রতিভাধর খেলোয়াড়েরা উঠে এসে প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা ওড়াবে দেশ-দেশান্তরে! সফল ক্রীড়াবিদরাই যে একটি দেশের সবচেয়ে বড় শুভেচ্ছাদূত।
মোদ্দাকথা, দেশের পরিবর্তিত পটভূমিতে বদলের ডাক দিয়ে বর্তমান সরকার যে নতুন হাওয়া ছড়িয়ে দিতে চাইছে, সেটি ভালো করেই ছুঁয়ে যাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনকে। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সকাল-সন্ধ্যা ব্যস্ত থাকছেন ঠাসা কর্মসূচিতে। খেলার ভুবনের যারা কেন্দ্রবিন্দু, সেই খেলোয়াড়দের কাছে যাচ্ছেন, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে বসছেন, সব অংশীদারের সঙ্গে গড়ে তুলছেন উষ্ণ যোগাযোগ। খেলার মানুষ বলেই স্টার্ট-আপ বলার আগেই তিনি এগিয়ে রয়েছেন দুই কদম। আগের এক ক্রীড়ামন্ত্রীর মতো ক্রীড়া পাঠশালার শিক্ষার্থীর অনুভূতি তার মধ্যে নেই।
আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলে ক্রীড়াঙ্গনে বদল প্রক্রিয়া শুরু আরো আগে। নতুন ক্রীড়া উপদেষ্টার নেতৃত্বে নির্বাচিত সিল মারা ফেডারেশনগুলোকে ভেঙে দিতে দেখলাম। সব ফেডারেশনই যে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ সংগঠকদের দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। এর মধ্যে ক্রিকেট বোর্ড নয় মাসের ব্যবধানে পায় দুজন সভাপতি। যে খেলাটি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের পরিচিতির সবচেয়ে বড় বাহক, সেটি কেবলই রাজনীতির ছোবল খেতে থাকলো। অধিকারের জমিতে দাঁড়িয়েও একটি টি-২০ বিশ্বকাপে উড়লো না লাল-সবুজ।
তবে মাঠের বাইরে যেমনটাই ঘটুক, মাঠের ক্রিকেট বাংলাদেশকে বাঁক বদলের সময়টিতেও কিছু না কিছু দিয়েছে, যেমন করে সে দিয়ে আসছে। পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাটিতে ধবল ধোলাই করে টেস্ট সিরিজ জয়ের বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটিয়েছে বাংলাদেশ। নাহিদ রানা নামের এক বিস্ময়ের আবির্ভাবে বাংলাদেশের গতিময় বোলিংয়ের নতুন বিজ্ঞাপন দেখছে ক্রিকেটের পৃথিবী।
এদিকে, মেয়েদের তোলা আলোড়নের পাশে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সুরভির নাম হামজা চৌধুরী। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারের প্রভাবে ফুটবলের শুষ্কধারায় তির তির করে বইতে শুরু করেছে নতুন স্রোত।
এখন পরিবর্তনের হাওয়ায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন খুঁজে নিতে চায় নতুন পথরেখা। সব মলিনতা মুছে যে পথে নির্মাণ করা যাবে সাফল্যের সোনালি সৌধ।
লেখক: সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক, বর্তমানে এটিএন নিউজের ক্রীড়া সম্পাদক

অপ্রত্যাশিতভাবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে পারেননি আমিনুল হক। তবু্ও হলেন নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপার। সাফ ও সাফ গেমসের শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক। খেলার মানুষ, মাঠের মানুষ। আমিনুল নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিলেন। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ভাবী প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছিলেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান। আই হ্যাভ আ প্ল্যান।
এই প্ল্যানে যে ক্রীড়াঙ্গন ছিল, সেটি তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারই বলে দিয়েছে। আর আমরা তো জানি ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্যে মূর্ত হয় জনতার অবাধ উচ্ছ্বাস আর আবেগ। ক্রীড়াঙ্গনের চরিত্র মূলত অরাজনৈতিক, ভাষা সর্বজনীন আর সংগীতটা সাম্যের।
ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা-এই প্রতিপাদ্যে গত ৩০ মার্চ দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে দিলেন ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা। কদিন পর আরো ১৭১ জনকে তালিকাভুক্ত করে প্রাথমিকভাবে ৫০০ জনের প্রকল্পে সংখ্যাটা উন্নীত করা হয়েছে ৩০০ জনে। বিভিন্ন খেলার এই খেলোয়াড়েরা মাসিক ১ লাখ টাকা ভাতা পাবেন। তিন মাস অন্তর পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে খেলোয়াড়দের ভাতা প্রাপ্তির তালিকাটা সংশোধিত হতে থাকবে।আগেও যে খেলোয়াড়দের ভাতা দেয়া হয়নি, তা নয়। কিন্তু ক্রিকেট বাদে অন্যান্য ক্রীড়া ফেডারেশনভিত্তিক সেই ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত এবং যৎকিঞ্চিত। কোনো অবস্থাতেই খেলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার মতো উৎসাহ তা জোগাতো না। নৈরাশ্য কিংবা উৎসাহহীনতার সেই জায়গাটিতে একটি প্রবল আশাবাদ নিয়ে এসেছে নতুন এই প্রণোদনা। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের নারী হকি দল ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বে রানার্সআপ হয়ে মূল পর্বের টিকিট পেল। আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের র্র্যাংকিংয়ে এখনো নামই ওঠেনি, প্রথম আন্তজার্তিক টুর্নামেন্ট।
সেরা চারে থেকে কোয়ালিফাই করাটাই যেখানে সংশয়ে ঢাকা, মেয়েরা সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালেই উঠে গেল। সেখানেও দুর্ভাগ্য পিছু না নিলে চ্যাম্পিয়ন হয়েই ফিরতো। কী এই অভাবিত সাফল্যের রহস্য? অর্পিতা-রিয়ারা বললেন, ক্রীড়াভাতা পেয়ে মনটা ফুরফুরে, নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে খেলতে ভেতর থেকেই অন্যরকম অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তারা।
বাছাই করা খেলা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। মূলধারার খেলাগুলোর দিকে আরো বেশি নজর না দিয়ে ব্রিজ, ক্যারম, রাগবি, সেপাক টাকরো ইত্যাদি অপ্রধান খেলা বাংলাদেশের সমাজে কী প্রভাব ফেলবে, সেই প্রশ্ন থাকছে।
এরই পাশাপাশি আমরা উন্মোচিত হতে দেখলাম নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৬ সালে শিশু-কিশোরদের পারফর্মিং আর্টের প্রতিযোগিতার আদলে দেশব্যাপী ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণের বাছাই প্রতিযোগিতা চলছে। এখান থেকেই ছেঁকে আনা হবে আগামীর তারকাদের। এই প্রথম প্রতিভা অনুসন্ধান শুরু হলো, বিষয়টি এমনও নয়। এর আগে বহুবার বহুরূপে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশন, জাতীয় পরিষদ, ক্রীড়া পরিদপ্তর এই কাজটি করেছে। তারপরও সাড়ম্বরে আরম্ভ হওয়া নতুন সরকারের এই কর্মসূচির সাফল্যের অপেক্ষায় থাকতে চায় ক্রীড়ামনষ্ক বাংলাদেশ। সবার আশা নতুন প্রতিভাধর খেলোয়াড়েরা উঠে এসে প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা ওড়াবে দেশ-দেশান্তরে! সফল ক্রীড়াবিদরাই যে একটি দেশের সবচেয়ে বড় শুভেচ্ছাদূত।
মোদ্দাকথা, দেশের পরিবর্তিত পটভূমিতে বদলের ডাক দিয়ে বর্তমান সরকার যে নতুন হাওয়া ছড়িয়ে দিতে চাইছে, সেটি ভালো করেই ছুঁয়ে যাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনকে। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সকাল-সন্ধ্যা ব্যস্ত থাকছেন ঠাসা কর্মসূচিতে। খেলার ভুবনের যারা কেন্দ্রবিন্দু, সেই খেলোয়াড়দের কাছে যাচ্ছেন, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে বসছেন, সব অংশীদারের সঙ্গে গড়ে তুলছেন উষ্ণ যোগাযোগ। খেলার মানুষ বলেই স্টার্ট-আপ বলার আগেই তিনি এগিয়ে রয়েছেন দুই কদম। আগের এক ক্রীড়ামন্ত্রীর মতো ক্রীড়া পাঠশালার শিক্ষার্থীর অনুভূতি তার মধ্যে নেই।
আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলে ক্রীড়াঙ্গনে বদল প্রক্রিয়া শুরু আরো আগে। নতুন ক্রীড়া উপদেষ্টার নেতৃত্বে নির্বাচিত সিল মারা ফেডারেশনগুলোকে ভেঙে দিতে দেখলাম। সব ফেডারেশনই যে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ সংগঠকদের দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। এর মধ্যে ক্রিকেট বোর্ড নয় মাসের ব্যবধানে পায় দুজন সভাপতি। যে খেলাটি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের পরিচিতির সবচেয়ে বড় বাহক, সেটি কেবলই রাজনীতির ছোবল খেতে থাকলো। অধিকারের জমিতে দাঁড়িয়েও একটি টি-২০ বিশ্বকাপে উড়লো না লাল-সবুজ।
তবে মাঠের বাইরে যেমনটাই ঘটুক, মাঠের ক্রিকেট বাংলাদেশকে বাঁক বদলের সময়টিতেও কিছু না কিছু দিয়েছে, যেমন করে সে দিয়ে আসছে। পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাটিতে ধবল ধোলাই করে টেস্ট সিরিজ জয়ের বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটিয়েছে বাংলাদেশ। নাহিদ রানা নামের এক বিস্ময়ের আবির্ভাবে বাংলাদেশের গতিময় বোলিংয়ের নতুন বিজ্ঞাপন দেখছে ক্রিকেটের পৃথিবী।
এদিকে, মেয়েদের তোলা আলোড়নের পাশে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সুরভির নাম হামজা চৌধুরী। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারের প্রভাবে ফুটবলের শুষ্কধারায় তির তির করে বইতে শুরু করেছে নতুন স্রোত।
এখন পরিবর্তনের হাওয়ায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন খুঁজে নিতে চায় নতুন পথরেখা। সব মলিনতা মুছে যে পথে নির্মাণ করা যাবে সাফল্যের সোনালি সৌধ।
লেখক: সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক, বর্তমানে এটিএন নিউজের ক্রীড়া সম্পাদক

ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া
পবিত্র কুণ্ডু

অপ্রত্যাশিতভাবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে পারেননি আমিনুল হক। তবু্ও হলেন নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলকিপার। সাফ ও সাফ গেমসের শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক। খেলার মানুষ, মাঠের মানুষ। আমিনুল নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিলেন। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ভাবী প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছিলেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান। আই হ্যাভ আ প্ল্যান।
এই প্ল্যানে যে ক্রীড়াঙ্গন ছিল, সেটি তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারই বলে দিয়েছে। আর আমরা তো জানি ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্যে মূর্ত হয় জনতার অবাধ উচ্ছ্বাস আর আবেগ। ক্রীড়াঙ্গনের চরিত্র মূলত অরাজনৈতিক, ভাষা সর্বজনীন আর সংগীতটা সাম্যের।
ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা-এই প্রতিপাদ্যে গত ৩০ মার্চ দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে দিলেন ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা। কদিন পর আরো ১৭১ জনকে তালিকাভুক্ত করে প্রাথমিকভাবে ৫০০ জনের প্রকল্পে সংখ্যাটা উন্নীত করা হয়েছে ৩০০ জনে। বিভিন্ন খেলার এই খেলোয়াড়েরা মাসিক ১ লাখ টাকা ভাতা পাবেন। তিন মাস অন্তর পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে খেলোয়াড়দের ভাতা প্রাপ্তির তালিকাটা সংশোধিত হতে থাকবে।আগেও যে খেলোয়াড়দের ভাতা দেয়া হয়নি, তা নয়। কিন্তু ক্রিকেট বাদে অন্যান্য ক্রীড়া ফেডারেশনভিত্তিক সেই ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত এবং যৎকিঞ্চিত। কোনো অবস্থাতেই খেলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার মতো উৎসাহ তা জোগাতো না। নৈরাশ্য কিংবা উৎসাহহীনতার সেই জায়গাটিতে একটি প্রবল আশাবাদ নিয়ে এসেছে নতুন এই প্রণোদনা। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের নারী হকি দল ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বে রানার্সআপ হয়ে মূল পর্বের টিকিট পেল। আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের র্র্যাংকিংয়ে এখনো নামই ওঠেনি, প্রথম আন্তজার্তিক টুর্নামেন্ট।
সেরা চারে থেকে কোয়ালিফাই করাটাই যেখানে সংশয়ে ঢাকা, মেয়েরা সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালেই উঠে গেল। সেখানেও দুর্ভাগ্য পিছু না নিলে চ্যাম্পিয়ন হয়েই ফিরতো। কী এই অভাবিত সাফল্যের রহস্য? অর্পিতা-রিয়ারা বললেন, ক্রীড়াভাতা পেয়ে মনটা ফুরফুরে, নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে খেলতে ভেতর থেকেই অন্যরকম অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তারা।
বাছাই করা খেলা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। মূলধারার খেলাগুলোর দিকে আরো বেশি নজর না দিয়ে ব্রিজ, ক্যারম, রাগবি, সেপাক টাকরো ইত্যাদি অপ্রধান খেলা বাংলাদেশের সমাজে কী প্রভাব ফেলবে, সেই প্রশ্ন থাকছে।
এরই পাশাপাশি আমরা উন্মোচিত হতে দেখলাম নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৬ সালে শিশু-কিশোরদের পারফর্মিং আর্টের প্রতিযোগিতার আদলে দেশব্যাপী ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণের বাছাই প্রতিযোগিতা চলছে। এখান থেকেই ছেঁকে আনা হবে আগামীর তারকাদের। এই প্রথম প্রতিভা অনুসন্ধান শুরু হলো, বিষয়টি এমনও নয়। এর আগে বহুবার বহুরূপে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশন, জাতীয় পরিষদ, ক্রীড়া পরিদপ্তর এই কাজটি করেছে। তারপরও সাড়ম্বরে আরম্ভ হওয়া নতুন সরকারের এই কর্মসূচির সাফল্যের অপেক্ষায় থাকতে চায় ক্রীড়ামনষ্ক বাংলাদেশ। সবার আশা নতুন প্রতিভাধর খেলোয়াড়েরা উঠে এসে প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা ওড়াবে দেশ-দেশান্তরে! সফল ক্রীড়াবিদরাই যে একটি দেশের সবচেয়ে বড় শুভেচ্ছাদূত।
মোদ্দাকথা, দেশের পরিবর্তিত পটভূমিতে বদলের ডাক দিয়ে বর্তমান সরকার যে নতুন হাওয়া ছড়িয়ে দিতে চাইছে, সেটি ভালো করেই ছুঁয়ে যাচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনকে। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সকাল-সন্ধ্যা ব্যস্ত থাকছেন ঠাসা কর্মসূচিতে। খেলার ভুবনের যারা কেন্দ্রবিন্দু, সেই খেলোয়াড়দের কাছে যাচ্ছেন, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে বসছেন, সব অংশীদারের সঙ্গে গড়ে তুলছেন উষ্ণ যোগাযোগ। খেলার মানুষ বলেই স্টার্ট-আপ বলার আগেই তিনি এগিয়ে রয়েছেন দুই কদম। আগের এক ক্রীড়ামন্ত্রীর মতো ক্রীড়া পাঠশালার শিক্ষার্থীর অনুভূতি তার মধ্যে নেই।
আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলে ক্রীড়াঙ্গনে বদল প্রক্রিয়া শুরু আরো আগে। নতুন ক্রীড়া উপদেষ্টার নেতৃত্বে নির্বাচিত সিল মারা ফেডারেশনগুলোকে ভেঙে দিতে দেখলাম। সব ফেডারেশনই যে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ সংগঠকদের দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। এর মধ্যে ক্রিকেট বোর্ড নয় মাসের ব্যবধানে পায় দুজন সভাপতি। যে খেলাটি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের পরিচিতির সবচেয়ে বড় বাহক, সেটি কেবলই রাজনীতির ছোবল খেতে থাকলো। অধিকারের জমিতে দাঁড়িয়েও একটি টি-২০ বিশ্বকাপে উড়লো না লাল-সবুজ।
তবে মাঠের বাইরে যেমনটাই ঘটুক, মাঠের ক্রিকেট বাংলাদেশকে বাঁক বদলের সময়টিতেও কিছু না কিছু দিয়েছে, যেমন করে সে দিয়ে আসছে। পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাটিতে ধবল ধোলাই করে টেস্ট সিরিজ জয়ের বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটিয়েছে বাংলাদেশ। নাহিদ রানা নামের এক বিস্ময়ের আবির্ভাবে বাংলাদেশের গতিময় বোলিংয়ের নতুন বিজ্ঞাপন দেখছে ক্রিকেটের পৃথিবী।
এদিকে, মেয়েদের তোলা আলোড়নের পাশে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সুরভির নাম হামজা চৌধুরী। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারের প্রভাবে ফুটবলের শুষ্কধারায় তির তির করে বইতে শুরু করেছে নতুন স্রোত।
এখন পরিবর্তনের হাওয়ায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন খুঁজে নিতে চায় নতুন পথরেখা। সব মলিনতা মুছে যে পথে নির্মাণ করা যাবে সাফল্যের সোনালি সৌধ।
লেখক: সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক, বর্তমানে এটিএন নিউজের ক্রীড়া সম্পাদক

ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখার ঘোষণা আমিনুল হকের


