শিরোনাম

যেখানে বিদ্যুৎ এসেই বলে ‘যাই’

যেখানে বিদ্যুৎ এসেই বলে ‘যাই’
Load sheding

আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা…কখনো আরও বেশি সময়। অপেক্ষা, অপেক্ষা আর অপেক্ষা। দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে যদিও বা তাকে পাওয়া যায়, কিন্তু এসে খানিক পরই আবার সে নাই হয়ে যায়। অতঃপর, আবার শুরু হয় অপেক্ষার পালা।

প্রিয়তমার জন্য এমন অপেক্ষার প্রহর গোনা এবং তাকে অল্প সময়ের জন্য পাওয়া নিয়ে কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন—রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে/ অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে/ কেবল তোমার জন্যে বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে–/সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে–‘যাই’। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে বিদ্যুতের জন্য এভাবেই অপেক্ষা করে থাকে গ্রামাঞ্চলের মানুষ। বিদ্যুৎ চলে যায়, আর আসে না। এক–দুই ঘণ্টা তো বটেই, কখনো কখনো আরও বেশি সময়ও থাকে লোডশেডিং। চাতক পাখি যেমন বৃষ্টির এক ফোঁটা পানির জন্য চেয়ে থাকে আকাশপানে, গ্রামের মানুষ তেমনি তাকিয়ে থাকে বিদ্যুতের আসার অপেক্ষায়। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিদ্যুৎ একটা সময় আসে ঠিকই, কিন্তু রফিক আজাদের কবিতার লাইনের মতোই সুন্দর অ্যালুমিনিয়ামের তারে পরিবাহিত হয়ে বিদ্যুৎ এসেই বলে–‘যাই’!এবারের ঈদুল আজহায় লম্বা ছুটিই ছিল। পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদ করতে, আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে তাই অনেকের মতো আমিও গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে। বাড়িতে যাওয়ার আগে গ্রামে থাকা এক বন্ধু ফোন করে বলেছিল, ‘তোমাদের ঢাকায় লোডশেডিং কেমন হয়?’ উত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘অনেক এলাকায় লোডশেডিং হয়, কিন্তু খুব বেশি না। আর আমি যে এলাকায় থাকি, সেখানে লোডশেডিং হয় না বললেই চলে।’ এরপর বন্ধুটি বলেছিল, ‘বাচ্চাদের নিয়ে যেহেতু আসছো, একটা চার্জার ফ্যান কিনে নিয়ে এসো, বিদ্যুতের অবস্থা এখানে ভয়ংকর। একবার চলে গেলে আর আসে না, এলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায়।’

আমার বাড়ি বরিশালের মুলাদি উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। তবে এবারের ঈদে স্ত্রী–সন্তানদের নিয়ে ছিলাম উপজেলা সদরে। ছিমছাম ছবির মতো এক মফস্বল শহর মুলাদি। এবারের ঈদুল আজহায় গিয়ে সেখানে ছয়দিন ছিলাম। যেদিন বাড়িতে গেলাম, তার পরের দিন সকালবেলায় হালকা ঝোড়ো বাতাস বইল। বিদ্যুৎ বাবাজিও সেই সুযোগে ফুড়ুৎ করে চলে গেল। সেই যে গেল, আসার আর খবরটি পর্যন্ত নেই। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কোথায় নাকি ঝড়ে গাছ পড়েছে, বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই বিদ্যুৎ পেতে দেরি হবে।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেদিন বিদ্যুৎ এলো প্রায় রাত ১০টার পর। বিদ্যুৎ এসে বেশি হলে ৫ কী ৭ মিনিট থাকল, এরপর আবার উড়াল দিল! আবার এলো প্রায় দেড় ঘণ্টা পর। এবার ৪০ মিনিটের মতো থেকে আবার চলে গেল। আবার শুরু হলো বিদ্যুতের আলো ঝলমলে বদনখানি দেখার অপেক্ষা। কিন্তু সে এলো প্রায় দুই ঘণ্টা পর। বাড়ি যাওয়ার পর বিদ্যুতের যাওয়া–আসার এই যে লুকোচুরি খেলা দেখা শুরু হলো, চলল আসার দিন পর্যন্ত।

আমি তো এই লুকোচুরি খেলা দেখলাম মাত্র ছয়দিন। মুলাদির মানুষদের কাছে এই খেলা দেখা নিত্যদিনের ঘটনা। মুলাদি তো উপজেলা সদর, গ্রামের দিকে অবস্থা আরও বেগতিক। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, কখনো কখনো বিদ্যুৎ গেলে নাকি আর আসতেই চায় না গ্রামাঞ্চলে। এর ওপর এখন তো ঝড়–বৃষ্টির দিন, কখনো কখনো একটু বাতাস বইলে বা সামান্য বৃষ্টি আর বজ্রপাত হলে কথাই নেই; বিদ্যুৎ যে গা ঢাকা দেয়, তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না।

মুলাদি সদরে থাকলেও ঈদের দিন সকালে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে শুনলাম, তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ নেই, ফ্রিজ খোলা যাবে না, তাই কোরবানির মাংসও রাখা যাবে না; এ কারণে সেদিন অনেকেই পশু জবাই করেনি। আবার খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ঈদের পরের দিন রাতে আমাদের গ্রামের বাড়ি বোয়ালিয়ায় বিদ্যুৎ এসেছিল।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি, কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংয়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। দেশে বিদ্যুতের বর্তমান চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট। আর উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। তাই ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘাটতি মেটাতে যে লোডশেডিং করা হচ্ছে, তার প্রায় পুরোটাই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের মানুষের ওপর।

গ্রামের মানুষের বড় একটা অংশ মেগাওয়াট–টেগাওয়াট বোঝেন না, তারা বোঝেন বিদ্যুৎ আছে কী নেই। কেরোসিন তেলে জ্বালানো হারিকেনের জায়গায় তারা এখন বিজলিবাতিতে অভ্যস্ত, তালপাতার পাখার যুগ পেরিয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন বৈদ্যুতিক পাখায়। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া পাওয়া গ্রামের মানুষ এখন আর পুরোনো যুগে ফিরে যেতে চায় না। তাই তো লোডশেডিংয়ের অত্যাচার থেকে বাঁচতে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ব্যবস্থা আছে আইপিএসের।

কিন্তু ওই যে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন–কুইনাইন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে? মানে আইপিএস লোডশেডিংয়ের অত্যাচার কমাবে বটে, কিন্তু আইপিএস চার্জ হতে যেটুকু বিদ্যুৎ লাগে, সেটা দেবে কে!

/আরএ/