শিরোনাম

সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নিয়ে জটিলতা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

  • সংসদের প্রথম অধিবেশন: সভাপতি মনোনীত করবেন রাষ্ট্রপতি
  • স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে
  • স্পিকার হিসেবে ড. আবদুল মঈন খান এগিয়ে
নিজস্ব প্রতিবেদক
সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নিয়ে জটিলতা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

আগামী ১২ মার্চ বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদ সচিবালয় গত সোমবার প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সভাপতি মনোনীত হবেন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে গণঅভ্যুত্থানে সংসদ ভেঙে যাওয়ায় এবারের অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, কীভাবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন, তা এখন ‘টক অব দ্য মিডিয়া’। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে এবং সংসদীয় প্রসিডিংয়ে বলা আছে বিগত সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে সভাপতিত্ব করবেন এবং তাদের উপস্থিতিতে নতুন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবে।

কিন্তু ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদকে অবলুপ্ত ঘোষণা করেন। ফলে, আগের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার এখন আর নেই। এতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে সভাপতিত্ব ও নতুন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশেষ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। একটি নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া বাধ্যতামূলক। সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে। সে হিসেবে এবার বিএনপির এই নাম প্রস্তাব করার কথা রয়েছে।

যদি একক কোনো নাম প্রস্তাব করা হয় এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে, তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে সংসদ সদস্যদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তারা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পরেই স্পিকারের অবস্থান। এমনকী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির চেয়েও প্রটোকলে স্পিকারের অবস্থান ওপরে।

সেক্ষেত্রে সংবিধান ও সংসদ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে কার্যপ্রণালী বিধির ৫নং ধারা অনুযায়ী সরকার দলীয় মনোনীত কোন জেষ্ঠ্য ব্যক্তিই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে সভাপতিত্ব করবেন। তার পরিচালনায় সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।

এ বিষয়ে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এরকম সমস্যায় তো আগে কখনো পড়েনি জাতীয় সংসদ। এরকমটা হলে কী হবে তা আমি সরাসরি বলতে পারছি না। সংবিধানে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া আছে কিনা তা পড়ে আপনাকে জানাতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী এবারও সম্ভবত রাষ্ট্রপতি কাউকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনে সভাপতিত্ব করার অনুমতি দেবেন। বর্তমান সরকার যাকে চান, তিনিই প্রথম দিনে সংসদে সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

দ্বাদশ সংসদ রাষ্ট্রপতি ভেঙে দিয়েছেন। সুতরাং বিগত স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার বলে কিছু নেই। তাই রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে বর্তমান সরকারী দল তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন বয়োজেষ্ঠ্য এমপিকে সংসদের প্রথম দিনে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করবেন। আর তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হতে পারে। বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। তবে সবসময়ই এটি রাষ্ট্রপতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে এসেছে এবং রাষ্ট্রপতিই সরকারের শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। এবারও তাই ঘটতে যাচ্ছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, দ্বাদশ সংসদ তো রাষ্ট্রপতি ভেঙে দিয়েছেন। সুতরাং বিগত স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার বলে কিছু নেই। তাই রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে বর্তমান সরকারী দল তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন বয়োজেষ্ঠ্য এমপিকে সংসদের প্রথম দিনে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করবেন। আর তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হতে পারে।

এবারে কি জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো তো সংবিধান সংশোধন হয়নি। তাই সরকারী দল থেকে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার করা হতে পারে। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেবেন। প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্বের বিষয়টি কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণ করলে সহজভাবে সমাধান সম্ভব।

তিনি বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ৫নং ধারা অনুযায়ী, যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুজনের কেউ উপস্থিত না থাকে, তবে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নতুন সংসদ নেতার পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে একজনকে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য আহ্বান জানাতে পারেন। তিনি প্রথম দিনে সংসদ পরিচালনা করবেন এবং তার পরিচালনায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। নির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পরে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করবেন। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার রেওয়াজও রয়েছে।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতি

নিয়ম অনুযায়ী কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসাবে কারো নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন, এমন বিবৃতিও নোটিশের সাথে দিতে হবে। এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে।

অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলছিলেন, ‘যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকে তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।’

সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করা হবে। সেই সময়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। তারা শপথ নেওয়ার পরই তাদের সভাপতিত্বে শুরু হবে পরবর্তী সংসদের কার্যক্রম।

বিদ্যমান সংবিধানে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদশূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের পদেই বহাল থাকবে।

নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।

বিদ্যমান সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটি পদই সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়। তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারে যে জুলাই সনদ করা হয়েছে সেখানে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ রাখার কথা বলা হয়েছে।

স্পিকার হিসেবে বিএনপিতে আলোচনায় যিনি

বিএনপি সূত্র বলছে, দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনায় স্পিকার পদে ড. আবদুল মঈন খানের নাম বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে মন্ত্রিসভার পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও ড. খান এখনো সরকারের বাইরে আছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি পঞ্চমবারের মতো সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে প্রবীণ এ নেতাকে কোথায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনমনে।

/জেএইচ/