শিরোনাম

জুলাই হত্যা মামলায় ‘নিহত’ ব্যক্তি সৌদি আরবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই হত্যা মামলায় ‘নিহত’ ব্যক্তি সৌদি আরবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনের সময়ের একটি দৃশ্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থান সময় দেশের নানা স্থানে সংঘর্ষ, গুলি করে ও পুড়িয়ে হত্যাসহ নানা ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার কয়েকটি মামলায় বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

রাজধানী বিভিন্ন থানায় করা মামলায় কোথাও বাদীর অস্তিত্ব মেলেনি, আবার কোথাও ‘নিহত’ ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় দেশে রয়েছে। আবার কোনো মামলায় গুলিতে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি করা হলেও তদন্তে তার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে থাকা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ করে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। এই হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। এদিন বিভিন্ন স্থানে মোট ৬ জন নিহত হয়। সামাজিকমাধ্যমে নিহতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরের বছিলা, চানখারপুল, রামপুরায় চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড। দমন-পীড়নের মধ্যেও এই আন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর ৫০টি থানায় ৭০৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯। এর মধ্যে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলছে। ১৯টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে তিনটি মামলাকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে উর্লেখ করা হয়েছে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে। বাকি ১৬ মামলায় ভুল পরিচয়, তথ্যে অসঙ্গতি, ভুয়া কাগজপত্র ও ঘটনার বর্ণনায় বাস্তবতার অমিল দেখা গেছে।

আদালতে জমা দেওয়া এসব প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার মিথ্যা দাবি, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানোসহ বিভিন্ন ধরনের ভুয়া তথ্য দিয়ে জুলাই অভুত্থানের ঘিরে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার একটি ঘটনায় একটি মামলা হয়। এমনকি ওই মামলার বাদীরও কোনো অস্তিত্ব নেই। ওই মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মো. বাবু নিহত হয়েছেন- এমন অভিযোগে আদালতে মামলা হয়। মামলার আরজিতে বাদী হিসেবে ‘নিহত’ বাবুর খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া ইসমাঈল নামের একজনের স্বাক্ষর রয়েছে। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাসহ পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, মামলায় আরজিতে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুসারে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, বাবু নামে যার ‘নিহত’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তিনি জীবিত। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত।

এই মামলার বাদীর পরিচয় যাচাই করেও অসঙ্গতি পেয়েছে তদন্ত কর্মকর্তারা। এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করলে ইসমাঈল নয় বরং তিনি নিজেকে মিলন বলে দাবি করেন। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ধরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রামপুর এলাকায় ইসমাঈলের খোঁজ পায় পুলিশ। কিন্তু তিনি এই ধরনের কোনো মামলা করেননি বলে দাবি করেছেন। আদালতে উপস্থিত হয়েও ইসমাঈল একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলামের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরজিতে উল্লেখ করা ‘বাবু’ নামে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদ পরীক্ষা করে সেটি জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী কিংবা বাদীর অস্তিত্বও তদন্তে পাওয়া যায়নি। এসব কারণে তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে তুলে ধরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেইসঙ্গে আরজিতে নাম থাকা আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন।

রাজধানীর পল্টন থানার আরেকটি হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দেখতে পায়, গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা পারভেজ আলী নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই। মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিরও সত্যতা মেলেনি।

পিবিআই জানায়, আরাফাতের পায়ের পুরোনো কাটাছেঁড়ার দাগকেই গুলির চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পক্ষে কোনো চিকিৎসা সনদ দেখাতে পারেননি। তদন্ত শেষে মামলাটি ‘সত্য নয়’ বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

এ মামলায় পাবনার ট্রাকচালক চাচা-ভাতিজা আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে আসামি করা হয়েছিল। তবে তদন্তে তাদের কল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে পিবিআই নিশ্চিত হয়, ঘটনার সময় তারা রাজধানীতে ছিলেন না। তাদের দাবি, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন হয়রানির উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

আদাবর থানার আরেকটি হত্যা মামলাও তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ মামলায় বাদীর দেওয়া মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা যাচাই করে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নিহত দাবি করা ব্যক্তির পরিচয়ও অস্পষ্ট। তদন্ত শেষে পুলিশ মামলাটিকে মিথ্যা উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

/জেএইচ/