শিরোনাম

নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক কঠিন চ্যালেঞ্জ, কোন পথে সমাধান

নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক কঠিন চ্যালেঞ্জ,  কোন পথে সমাধান
গ্রাফিকস: সিটিজেন জার্নাল

বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। তবে দায়িত্ব নিয়েই তারা পাচ্ছে এক অস্বস্তিদায়ক ও ভঙ্গুর অর্থনীতি।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে,দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অভিঘাত মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকারকে সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার চাপ সামলাতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারের মতো একাধিক বড় চ্যালেঞ্জও একসঙ্গে তাদের মোকাবিলা করতে হবে।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পৃথক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক দিক থেকে নতুন সরকারের নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। পাশাপাশি তারা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু নতুন সরকারের জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একসঙ্গে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। এজন্য কিছু স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতির পাঁচ চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসা সচল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। তার মতে, এসব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে গতিশীল হবে।

নানা সূচকে পিছিয়ে থাকা অর্থনীতি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর্থিক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

নতুন সরকার যে অর্থনীতি পাচ্ছে, তার ভেতরে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, কম বিনিয়োগ, দুর্বল ব্যাংকখাত এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর্থিক খাতে কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরীর ভাষায়, সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

মুস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্দা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার করতে গিয়ে সেখানেও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় আরও কমেছে। একদিকে রাজস্ব আয় হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের মধ্য ভারসাম্যহীনতা বেড়েছে। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।

সংকট কাটাতে নতুন সরকারকে দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা বিনিয়োগ বাড়াতে পারে
মুস্তফা কে মুজেরী,সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ,বাংলাদেশ ব্যাংক

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন মুস্তফা কে মুজেরী। এ বিষয়ে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘সংকট কাটাতে নতুন সরকারকে দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। এ ছাড়া নতুন সরকারকে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর বিষয়েও জোর দিতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা চাঙা হলে রাজস্ব আয় বাড়বে।’

মূল্যস্ফীতি মানুষের বড় দুশ্চিন্তা

দেশে একপর্যায়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং টাকা ছাপানো বন্ধের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমেছে। তবে এই হার এখনও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।

খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সরকারের অন্য সব উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নত করার দিকে নজর দিতে হবে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা কর্মসংস্থানের সংকট

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে। গত দেড় বছরে দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ হয়নি।

বিনিয়োগে স্থবিরতার ফলাফল হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ— যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি, যা তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে।

মূলধন সংকটে গত এক বছরে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেকারত্ব বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখে।

এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে উল্লেখ করে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সরকার একটি সুবিধা পাবে। রাজনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে হবে-সে বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল| তবে এখন সেই অনিশ্চয়তার শঙ্কা কেটে গেছে।। ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তাদের শুধু নিশ্চয়তা দিলেই হবে না, তাদের কম দামে ও নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ দিতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে।

রপ্তানি আয় কমছে, চাপ বাড়ছে রিজার্ভে

রিজার্ভের প্রধান উৎস রপ্তানি আয় টানা ছয় মাস ধরে কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে রপ্তানি আয় ছিল ৪২০ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন টাকা। কিন্তু এক মাস পর রপ্তানি আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪১৯ বিলিয়ন টাকায়।

যদিও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। তবে রপ্তানি আয় কমতে থাকলে এই স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার।

ব্যাংকখাতে লুটপাটের ক্ষত এখনো শুকায়নি

ব্যাংকখাত নতুন সরকারের সামনে জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতেও হিমশিম খেয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারছে না। ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে না।

বৈদেশিক ঋণের চাপ বাস্তবতা

বাংলাদেশ বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে বিপুল ঋণের বোঝা বহন করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় এখনো ১৮৬ কোটি ডলার ছাড় বাকি রয়েছে। তবে এই অর্থ পেতে হলে নতুন সরকারকে কঠোর শর্ত মানতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোর ঝুঁকি রয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে। একই সঙ্গে এ কারণে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক খাতের সংস্কার পরামর্শ বাস্তবায়ন করাও সহজ হবে না।

কোন পথে এগোলে সংকট কাটবে

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য নতুন সরকারকে কিছু বাস্তব ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমত, তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সংস্কার জরুরি। তৃতীয়ত, ব্যাংকখাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনই হবে টেকসই প্রবৃদ্ধির চাবিকাঠি। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর নীতি এবং দৃশ্যমান সুশাসনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই নতুন সরকার এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল ও কল্যাণমুখী ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারবে।

/বিবি/