শিরোনাম

থার্ড টার্মিনালে বড় বিপত্তি রানওয়ে ও পার্কিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
থার্ড টার্মিনালে বড় বিপত্তি রানওয়ে ও পার্কিং
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের এভিয়েশন খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ২০১৭ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় থার্ড টার্মিনাল। এর কাজ প্রায় ৯৯.৯১ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এটি চালু হলে যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে। সেইসঙ্গে বাড়বে ফ্লাইটের চাপও। কিন্তু একটি মাত্র রানওয়ে ও সীমিত পার্কিং সক্ষমতার কারণে নতুন টার্মিনালের বাড়তি সুবিধা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বর্তমানে রানওয়ে ব্যস্ত থাকায় উড্ডয়নের আগে ৩০-৪০ মিনিট এবং অবতরণের আগে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত উড়োজাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টার্মিনাল চালুর পর ফ্লাইট সংখ্যা বাড়লে এ সংকট আরো তীব্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে শাহজালাল বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া নতুন টার্মিনাল হলেও উড়োজাহাজ পার্কিং সুবিধায় এ অঞ্চলের অন্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকছে ঢাকা।

তথ্য বলছে, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (দিল্লি) ২১০টি ফিজিক্যাল বে রয়েছে। পাশাপাশি ২৪০টি স্ট্যান্ড রয়েছে। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে ১১১টি কন্টাক্ট ও ৭৮টি রিমোট স্ট্যান্ড রয়েছে। আর থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে রয়েছে ১২০টি পার্কিং বে। এর বিপরীতে শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে উড়োজাহাজ পার্কিং বে রয়েছে ২১টি। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে আরো ৩৭টি পার্কিং বে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে পার্কিং বের সংখ্যা হবে ৫৮। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল অ্যাপ্রনে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও এটিকে পুরো বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বলা যায় না। বাস্তবে কতটি উড়োজাহাজ পরিচালনা করা যাবে, তা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রন, পার্কিং ও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ের ওপর নির্ভর করবে।

২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তাদের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের মধ্যে বোয়িং থেকে আরও ২১টি উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। তারা শাহজালালকে হাব হিসেবে ব্যবহার করছে। এছাড়া নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইটগুলোও ঢাকাকেন্দ্রিক। বর্তমানে শাহজালালে প্রায় ৩০টি বিদেশী এয়ারলাইন্স নিয়মিত যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বিমানবন্দরটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে উড়োজাহাজ চলাচল ৫৪৮টিতে দাঁড়াতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দরের পার্কিং সক্ষমতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, দিনে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনাকারী একাধিক এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি ফ্লাইট গেট ছাড়ার পর উড্ডয়ন পর্যন্ত গড়ে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগছে। অন্যদিকে অবতরণের আগে উড়োজাহাজকে গড়ে ২০-৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় আকাশে থাকতে হচ্ছে। এতে যাত্রীদের বিড়ম্বনার পাশাপাশি এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্কিং সংকট মোকাবেলায় ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর দিতে হবে। তাদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও স্লট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে শক্তিশালী ট্রানজিট সেন্টারে রূপান্তর করা সম্ভব। থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে শাহজালালের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছাবে। এর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৫০ লাখ যাত্রী বর্তমান রানওয়ে দিয়েই দক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবহন করা সম্ভব। তবে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বর্তমান রানওয়ের কার্যকারিতা শেষ হয়ে আসবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এদিকে বাড়তি চাপ সামলাতে একটি বিকল্প রানওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার পর এর নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এটি এখনো পরিকল্পনাধীন। বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালালকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব করতে শুধু অবকাঠামো তৈরি যথেষ্ট নয়। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা লাগবে। সরকার অবকাঠামো তৈরি করবে, আর এটিকে হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এয়ারলাইনসগুলোর। বিভিন্ন আঞ্চলিক গন্তব্য থেকে যাত্রী এনে বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে দূরবর্তী গন্তব্যে নেওয়ার সক্ষমতা তাদেরেই তৈরি করতে হবে।

/জেএইচ/