শিরোনাম

নেপালের আকস্মিক বন্যার প্রভাব কী বাংলাদেশেও পড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
নেপালের আকস্মিক বন্যার প্রভাব কী বাংলাদেশেও পড়বে
হিমবাহসৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে বিস্তীর্ণ এলাকার বড় বড় ভবন, সড়ক ও সেতু বিধ্বস্ত হয়।

হিমবাহধসে সৃষ্ট নেপালের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে দেশটির অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বড় বড় ভবন, সেতু, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠোমো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রবিবার পর্যন্ত ৭৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ। খুব কাছের দেশ হিসেবে নেপালের এই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদেরা নেপালের এই বন্যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না বলে আশ্বস্ত করেছেন। তারা বলছেন, নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের নদীর সরাসরি সংযোগ থাকলেও এই ধরনের বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক বড় কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার আশঙ্কা কম। দীর্ঘ নদীপথ, পথে পলি ও পানির বিস্তার এবং ফারাক্কা ব্যারেজের মতো প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকায় নেপালের এই বন্যার প্রভাব বাংলাদেশে সেভাবে পড়বে না।

তবে নেপালের এ ধরনের দুর্যোগ ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশকে সতর্ক করছে বলে মনে করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ (ধীরগতিতে চলমান বিশাল বরফের স্তূপ) গলা, পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক বন্যার মতো ঘটনা বাড়লে আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর ক্ষেত্রে আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও জরুরি হয়ে উঠবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ২৬ আগস্ট তিব্বত ও নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিপুল পরিমাণ বরফের স্তূপ ধসে পড়ে। এর ফলে নেপালের পার্বত্য অঞ্চল রসুয়া এলাকায় বরফ, নুড়ি-পাথর ও পানির প্রবাহ তৈরি হয়। পরে আকস্মিক ও অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক বন্যা সৃষ্টি হলে বিপুল পরিমাণ পানি তীব্র গতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হয়।

এ ধরনের ঘটনা এখন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ গলছে। এতে পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়ে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসার পাশাপাশি নুড়ি-পাথর, সেডিমেন্টসহ বিভিন্ন উপাদানও পানির সঙ্গে নিচে নেমে আসে।

তবে এসব উপাদান নদীপথে বাংলাদেশ পর্যন্ত একই গতিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা কম বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, কোশি ও গঙ্গা নদী হয়ে এসব উপাদান পদ্মার দিকে আসার সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘ পথ অতিক্রমের সময় প্রবাহের শক্তি কমে যায়। নদীর এই স্বাভাবিক ক্ষয়ের কারণে বাংলাদেশে এ ধরনের বন্যার আশঙ্কা কম।

নেপালের পানি আসতে ৬৫০ কিলোমিটার পথ

ভৌগোলিকভাবে নেপালের নদ-নদীর সঙ্গে বাংলাদেশের নদীগুলোর একটি সংযোগ রয়েছে। নেপাল গঙ্গা অববাহিকার অন্যতম উজানের দেশ। দেশটির বিভিন্ন নদীর পানি পরবর্তীতে ভারতের নদ-নদীর মাধ্যমে গঙ্গার মূল প্রবাহে যুক্ত হয়। পরে সেই পানির প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

নেপালে হিমবাহ গলে সৃষ্ট বন্যায় ও কাদামাটির ঢলে নদীর পাড়ের ভবন, সেতু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপালে হিমবাহ গলে সৃষ্ট বন্যায় ও কাদামাটির ঢলে নদীর পাড়ের ভবন, সেতু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, নেপালের ত্রিশূলী, ভোতেকোশিসহ যেসব নদী অববাহিকায় সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা হয়েছে, সেগুলো মূলত নারায়ণী নদীর উপনদী। নারায়ণী নদী ভারতে প্রবেশের পর গণ্ডক নাম ধারণ করেছে। পরে এটি ভারতের বিহারে পাটনার কাছাকাছি গিয়ে গঙ্গা নদীর মূল শাখার সঙ্গে যুক্ত হয়।

সরদার উদয় রায়হান আরও বলেন, নেপাল সীমান্ত থেকে ভারতের পাটনা পর্যন্ত গণ্ডক নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। এরপর পাটনা থেকে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পর্যন্ত আরও প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ। অর্থাৎ নেপালের ওই অঞ্চলের পানি বাংলাদেশের সীমান্তে পৌঁছাতে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এ কারণে নেপালে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটলেই তার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে এমনটা নয়।

উদয় রায়হান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের গঙ্গা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল রয়েছে। একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার অংশেও গঙ্গার মূল শাখায় আকস্মিক বন্যার পর উল্লেখযোগ্য পানি বৃদ্ধি এখনো পরিলক্ষিত হয়নি।

পাথর-পলি ভেসে আসার আশঙ্কাও কম

নেপালের সাম্প্রতিক ‘হরপা বানে’ বিপুল পরিমাণ শিলা, পাথর ও অন্যান্য উপাদান পানির স্রোতে ভেসে এসেছে। ফলে উজানের নদীপথে এসব উপাদান নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

১৯৯৮-এর মতো বন্যার আশঙ্কা নেই

নেপালে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা এবারই প্রথম না। গত দেড়-দুই দশকে দেশটিতে একাধিকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু নেপালে কোনো আকস্মিক বন্যা হলেই বাংলাদেশে বড় বন্যা হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয় না।

এ বিষয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, নেপাল থেকে নদীর পানি ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহার হয়ে গঙ্গার মূল প্রবাহে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে আসে। তবে বাংলাদেশের বড় বন্যার সঙ্গে শুধু উজানের কোনো একটি স্থানে আকস্মিক বন্যা নয়, বরং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ও অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক বেশি।

১৯৯৮ সালের বন্যার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই সময়ে বাংলাদেশসহ উজানের ভারত ও নেপালের গঙ্গা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অব্যাহত মৌসুমি ও অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এর ফলে নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন অংশে বন্যা হয় এবং তার প্রভাব ভাটির বাংলাদেশেও পড়ে। সেই বন্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৯৮ সালের মতো নয় বলে জানান উদয় রায়হান। তার মতে, বর্তমানে মৌসুমি বৃষ্টিপাত মূলত স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী কিছুদিন বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ১৯৯৮ সালের মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি এখনো তৈরি হয়নি। ফলে ওই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও আপাতত নেই।

তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কম, দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা জরুরি

নেপালের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা বা হরপা বানের তাৎক্ষণিক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার আশঙ্কা কম হলেও ঘটনাটি বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে যে, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বাড়লে ভাটির দেশগুলো কীভাবে আগাম প্রস্তুতি নেবে।

এ বিষয়ে নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ গলার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ও আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শুধু একটি দেশের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এবিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে নদীর পানি ও বন্যার আগাম সতর্কতা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল থেকে শুরু করে ভারত হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত এবং ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ক্ষেত্রে চীন, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বিত বন্যা পূর্বাভাস, অববাহিকাভিত্তিক ফোরকাস্টিং এবং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি।

তার মতে, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ডাটা শেয়ারিং। উজানের কোনো দেশে আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ গলা বা পাহাড় ধসের মতো ঘটনা ঘটলে তার তথ্য দ্রুত ভাটির দেশগুলোর কাছে পৌঁছানো গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

/বিবি/