শিরোনাম

স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়মের পাহাড়, অভিযোগের পরও নীরব কর্তৃপক্ষ

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়মের পাহাড়, অভিযোগের পরও নীরব কর্তৃপক্ষ
কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচিতে খাবার সরবরাহে ঘাটতি এবং নিম্নমানের ও বাসি খাবার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নেত্রকোনা, নীলফামারী, ময়মনসিংহ ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া অভিযোগের পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দায়ী প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোথাও দীর্ঘদিন খাবার সরবরাহ বন্ধ আবার কোথাও নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় অনেক কম খাবার সরবরাহ এবং কোথাও নিম্নমানের ও বাসি খাবার দেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগের পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও সেই তদন্ত কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি। ফলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও ঝুলে রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন উপজেলা থেকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির বাস্তব চিত্র নিয়মিতভাবে অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। পরে সেসব তথ্য প্রকল্প কার্যালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমতা ট্রেডার্স-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় খাবার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।

একই সঙ্গে নেত্রকোনা সদর উপজেলায় দুধ ছাড়া অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রী নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় খুবই কম সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে।

এদিকে, গত ৯ জুলাই নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার নয়ানখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবারে পচা ডিম সরবরাহের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে সিলিন্ডার গ্যাসের চুলায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে ডিম সিদ্ধ করার ঘটনাও দেখতে পান। পরে তিনি প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে খাবারের মান নিশ্চিত এবং নিয়মিত তদারকি জোরদারের নির্দেশ দেন।

নেত্রকোনা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত ২২ জুন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৭ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ১৩ কার্যদিবসে উপজেলাটিতে বনরুটি সরবরাহের কথা ছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৭টি। কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২৮ হাজার ৯৮৭টি। ডিম দেওয়ার কথা ছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৩টি, সরবরাহ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৫৯টি। কলা দেওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪টি, পৌঁছেছে মাত্র ৫ হাজার ৩টি। বিস্কুট দেওয়ার কথা ছিল ৫০ হাজার ৬১৪ প্যাকেট, দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩২০ প্যাকেট। তবে দুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৫০ হাজার ৬১৪ প্যাকেটের বিপরীতে ৪৩ হাজার ৮০ প্যাকেট সরবরাহ করা হয়েছে।

এছাড়া, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ৭ জুন বিদ্যালয় খোলার পর থেকেই খাবার পৌঁছায়নি।

একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছেন না তারা। এতে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু সরবরাহ ঘাটতিই নয়, খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। মাদারীপুরে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পচা ডিম ও বাসি পাউরুটি সরবরাহের অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে সমতা ট্রেডার্সের অপারেশনস ম্যানেজার এ এফ এম আহসানুল হাবিব ও মো. নুরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জানা যায়, বর্তমানে দেশের নির্বাচিত ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলমান ৫ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার এ প্রকল্পে এরই মধ্যে ২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন বনরুটি, সিদ্ধ ডিম, ফর্টিফায়েড বিস্কুট, ইউএইচটি দুধ এবং কলা বা মৌসুমি ফল সরবরাহের কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী খাবারের মান, পরিমাণ কিংবা সরবরাহে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিলের বিধান রয়েছে। তবে একাধিক জেলায় একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও এখন পর্যন্ত কার্যাদেশ বাতিল কিংবা দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ খাদ্য নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, অবহেলা বা দুর্নীতি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট গার্ডিয়ান কমিটির মাধ্যমে তদারকি, আকস্মিক পরিদর্শন এবং অভিযোগ পাওয়া মাত্র তদন্তের ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়।

তবে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার কয়েক দিন পরও তদন্তের অগ্রগতি কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

এসব বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মরিয়ম বেগম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ আসে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। স্কুল ফিডিংয়ের অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তবে এখনো তদন্ত বা পরবর্তী কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় মন্ত্রণালয় কোনো হালনাগাদ তথ্য পায়নি। কার্যক্রম শেষ হলে সে বিষয়ে জানানো সম্ভব হবে।’

/এফআর/