শিরোনাম

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে পচা ডিম, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে পচা ডিম, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
মেহেরপুরের গাংনীতে গত ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা ডিম

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া কমানোর লক্ষ্য নিয়ে গত বছরের ১৫ নভেম্বর শুরু হয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। সরকারের প্রত্যাশা ছিল– ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পরিবেশে শিশুরা আরো আগ্রহ নিয়ে বিদ্যালয়ে আসবে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে মাঠপর্যায়ে অনেক বিদ্যালয়ে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করায় শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কোথাও শক্ত ও বাসি বানরুটি, কোথাও পচা ডিম, আবার কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এ কর্মসূচিতে নিম্নমানের খাবার উল্টো সন্তানদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার ৯৮ নং পূর্ব ধানসাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ১ জুলাই টিফিনের সময় শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয় সেদ্ধ ডিম। কিছু সময় পরই একের পর এক শিশু পেটব্যথায় কাতরাতে শুরু করে। কারো বমি বমি ভাব হয়। দ্রুত তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

একই দিন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা সেদ্ধ ডিমের বেশ কিছু ছিলো পচা। পাউরুটিতে ছিলো ছত্রাক। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় ডিমের কুসুমে কালো আবরণ ও দুর্গন্ধযুক্ত পাউরুটি পাওয়া যায়। এসব খাবার খেয়ে অনেক সময়ই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সম্প্রতি দুধ খেয়ে কয়েকজন অসুস্থ হয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে মাদারীপুর সদর উপজেলার ৫টি বিদ্যালয়ের অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী টিফিনের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পূর্ব ধানসাগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম জানান, প্রায় দিনই পচা ডিম, নিম্নমানের কলা ও পাউরুটিতে ছত্রাক পাওয়া যায়। একাধিকবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু মানহীন খাবারই নয়, নির্ধারিত ওজনের তুলনায় কম ওজনের খাবার সরবরাহ করারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ডিম আকারে ছোট, কলা কখনো কাঁচা কখনো অতিরিক্ত পাকা দেওয়া হয়।

বাঁশবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্নমানের খাদ্য বিতরণের অভিযোগ তদন্ত করেছে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা ১৩৩টি ডিমের মধ্যে ২০টি ছিল নিম্নমানের। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়ের ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সুশীলনের নজরে আনে।

সুশীলনের এরিয়া ম্যানেজার সুমন হোসেন জানান, পচা ডিম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। তবে পাউরুটিতে ছত্রাকের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, ‘অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের খাবার শিক্ষকরা রেখে দিয়ে পরে তা সরবরাহ করে। এতে খাবারের মান কমে যেতে পারে।’

অভিযোগ রয়েছে, শুধু মানহীন খাবারই নয়, নির্ধারিত ওজনের তুলনায় কম ওজনের খাবার সরবরাহ করারও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ডিম আকারে ছোট, কলা কখনো কাঁচা কখনো অতিরিক্ত পাকা দেওয়া হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের ২৯ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন খাবার সরবরাহ করার কথা। ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ধাপে ধাপে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রকল্পটি চালু করার সময় সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার ১৬১ কোটি ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়।

সপ্তাহে ৫ দিন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট মেনু রয়েছে। রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ১২০ গ্রাম বনরুটি ও ৬০ গ্রাম ওজনের সেদ্ধ ডিম, সোমবার ১২০ গ্রাম বনরুটি ও ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, আর বুধবার ৭৫ গ্রাম ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও ১০০ গ্রাম মৌসুমি ফল সরবরাহের কথা।

জানা গেছে, এসব খাদ্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে সরবরাহের দায়িত্বে থাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এজেন্টের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করে। সরবরাহ ব্যবস্থার এ একাধিক স্তরকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে অনিয়মের সুযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দে বানরুটির জন্য যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে অনেক জায়গায় তার চেয়ে অনেক কম দামে কেনা হচ্ছে। ফলে বরাদ্দের অর্থ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। একই সঙ্গে খাবারের মান, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ তদারকির অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবারের যথাযথ মান নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা কোনো সুফল পাবে না। বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতালের নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান শারমীন আক্তার বলেন, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। এ সময়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নষ্ট বা দূষিত খাবার শিশুর তাৎক্ষণিক অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ডায়রিয়া, খাদ্য বিষক্রিয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্রের (নিউরোলজিক্যাল) জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

/এফসি/